প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বরিশালে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। এই উপলক্ষ্যে দেশবাসীর প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কদিন আগে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে মিলে আমরা এই দেশ থেকে স্বৈরাচারী শাসন হটিয়েছি। এবার সময় এসেছে সবাই মিলেমিশে দেশের পুনর্গঠনে এবং উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করার।’

সোমবার বরিশালের ঐতিহাসিক ত্রিশ গোডাউন বধ্যভূমি এলাকায় সাগরদী খালের পাড়ে আয়োজিত এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত জনসাধারণের সামনে তার এই আহ্বান ব্যক্ত করেন। তিনি একটি নারিকেল গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম শেষে দেশ ও জাতির কল্যাণে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।

জাতীয় ঐক্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সাক্ষী, তখন দল-মত এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সকলে এক হয়ে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিলাম। ঠিক একইভাবে, খুব অল্প কিছু দিন আগেই আমরা সকলে রাজপথে নেমে এসে স্বৈরাচারকে বিদায় করেছি। সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ এই লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, আমরা যদি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশের জন্য এবং মানুষের জন্য কাজ করি, তবে আমরা সবাই উপকৃত হব এবং দেশ এগিয়ে যাবে।’

পরিবেশ রক্ষায় সাধারণ মানুষকে সচেতন করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পরিবেশ রক্ষা করা কেবল সরকারের একক দায়িত্ব নয়, কিংবা সিটি কর্পোরেশনের একার দায়বদ্ধতা নয়। এখানে আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। আসুন, আজকের এই বৃক্ষরোপণ দিবসে আমরা সকলে মিলে এই অঙ্গীকার করি যে— আমরা আমাদের দেশের পরিবেশ পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন রাখব। এটাই হোক আমাদের আজকের প্রধান প্রতিশ্রুতি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্রত্যেকে চেষ্টা করব আমাদের ব্যক্তিগত আঙিনা, ঘরবাড়ির চারপাশ, অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালের আশেপাশের পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয়। আমরা যদি আমাদের চারপাশের পরিবেশ সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখতে পারি, তবেই সামগ্রিক পরিবেশ উন্নত হবে।’

ত্রিশ গোডাউনের সাগরদী খালের গুরুত্ব উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘সাগরদী খালটি এই এলাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ। এই খালের যত্ন নেওয়া বা একে দূষণমুক্ত রাখা শুধু সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব নয়; বরং খালের দুই পাশে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব। আমরা দেখি খালের পানিতে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, টিস্যু পেপারসহ নানা ধরনের বর্জ্য ভাসছে। অনেকে পার্কে বেড়াতে এসে পানি পান করেন এবং বোতলটি খালের পানিতে ফেলে দেন। উপস্থিত সকলের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, আপনারা দয়া করে এই অভ্যাস ত্যাগ করুন এবং অন্যদেরও উৎসাহিত করুন যেন খালের ভেতর কোনো বর্জ্য না ফেলা হয়।’

সিটি কর্পোরেশনের কর্তৃপক্ষের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘এখানে ময়লা ফেলার বিন রাখা হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনকে অনুরোধ করব, মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রচার করুন যেন বিকেলে বেড়াতে আসা দর্শনার্থীরা বিনের মধ্যেই ময়লা ফেলেন। খালটিকে অবশ্যই পরিষ্কার রাখতে হবে।’

খালের দূষণ রোধে ড্রেনেজ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি লক্ষ্য করেছি খালের অপরপাড়ে একটি পাইপ বসানো হয়েছে, যা সরাসরি খালের সাথে যুক্ত। এটি সম্ভবত বাসা-বাড়ির ব্যবহৃত পানির পাইপ। সিটি কর্পোরেশনের কাছে আমার অনুরোধ, আপনারা যথাযথ ড্রেনেজ সিস্টেম নিশ্চিত করুন। সুয়ারেজ লাইনের সংযোগ সরাসরি খালের মধ্যে রাখা উচিত নয়, কারণ এতে পানি দূষিত হয় এবং সামগ্রিক পরিবেশ নষ্ট হয়। আমাদের নিজেদের পরিবেশ আমাদেরই রক্ষা করতে হবে।’

ব্যক্তিগত সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি আমাদের নিজেদের ঘর গুছিয়ে না রাখি, তবে ঘরটি যেমন অপরিচ্ছন্ন হয়ে যায়, ঠিক তেমনি আমরা যদি আমাদের এলাকা, পাড়া এবং দেশকে পরিষ্কার না রাখি, তবে শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী আমরাই হব। অন্য দেশের সুন্দর পরিবেশ দেখে আমরা আফসোস করি, কিন্তু নিজের দেশের সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষা করতে আমরা উদাসীন থাকি। এই মানসিকতা বদলাতে হবে।’

অনুষ্ঠানে পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, নৌ প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মজিবুর রহমান সারোয়ার, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, মাসুদ আহমেদ তালুকদার এবং সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরিনসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ খালের দুই পাড়ে বৃক্ষরোপণ করেন। এসময় উপস্থিত নেতাকর্মীরা ‘প্রধানমন্ত্রীর আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’, ‘এক জিয়া লোকান্তরে, লক্ষ জিয়া ঘরে ঘরে’ এবং ‘জিয়ার সৈনিক এক হও’ স্লোগানে এলাকা মুখরিত করে তোলেন।

বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সার্কিট হাউসে গমন করেন, যেখানে তিনি মধ্যাহ্নভোজ গ্রহণ করেন এবং জোহরের নামাজ আদায় করেন। বরিশাল সফরের শেষ কর্মসূচি হিসেবে তিনি শিল্পকলা একাডেমিতে দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন।