বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এমন একটি রাজনৈতিক সংগঠন, যা সর্বদা সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখা এবং অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই করে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই দলটি মূলত মানবতার পক্ষের সরকার গঠন করতে চায়। তারেক রহমান তার বাবা-মায়ের আদর্শ ও ঐতিহ্যের সেই পতাকাটিই আজ বহন করছেন, যা সাধারণ মানুষের মুক্তির কথা বলে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ফেনী সদর উপজেলার ফরহাদনগরে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। পুলিশের গুলিতে নিহত যুবদল নেতা হারুনুর রশিদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের জন্য নির্মিত একটি বাড়ির উদ্বোধন এবং তার স্মরণে আয়োজিত এক স্মরণসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে তিনি এই বক্তব্য প্রদান করেন।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ দুঃশাসনের কথা স্মরণ করে রুহুল কবির রিজভী তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা তার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য কোনো অন্যায় করতে দ্বিধাবোধ করেননি। শিশু, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে দেশজুড়ে গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের এক সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিল। সর্বশেষ জুলাই মাসে শেখ হাসিনার নির্দেশনায় পুলিশ ও র্যাব যেভাবে রক্তপাত ঘটিয়েছে, তা ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। রক্তের স্রোত বইয়ে দেওয়া হয়েছে রাজপথে, আর তারই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ফেনীর গর্ব, শহীদ হারুন।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে রিজভী বলেন, আমরা এক ভয়াবহ দুঃসময় এবং অন্ধকার যুগের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছি। এমন এক সময় ছিল যখন বিরোধী মত পোষণ করার অর্থ ছিল জীবন ঝুঁকিতে ফেলা। যারা বিরোধী দলের হয়ে কথা বলতেন, তাদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারটুকুও ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। স্বাভাবিক জীবনযাপন কিংবা রাতে শান্তিতে ঘুমানোর অধিকারটুকুও ছিল না অনেকের। কে কখন গুম হবেন, কার মৃত্যু হবে বিচারবহির্ভূতভাবে কিংবা কে হবে গুপ্ত হত্যার শিকার—তা কেউ জানতেন না। আমরা এক হিংস্র রাজত্বের মধ্যে দিনযাপন করেছি, যেখানে মানুষের জীবনের কোনো মূল্য ছিল না। শেখ হাসিনার ১৭ বছরের শাসনামলে অসংখ্য লাশ নদীর তীরে, খালে কিংবা নর্দমায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
পুলিশের গুলিতে নিহত হারুনুর রশিদের কথা স্মরণ করে বিএনপির এই নেতা আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, হারুনের স্বপ্ন ছিল একটি সুন্দর ও স্বাধীন দেশে বেঁচে থাকা। তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে। হারুন কখনো ব্যাংকের টাকা পাচার করেননি, পদ্মা সেতু কিংবা মেট্রোরেলের মতো বড় প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করেননি। তিনি কেবল কথা বলার স্বাধীনতা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দীর্ঘ আগে থেকেই গুম-খুনের শিকার হওয়া নেতাকর্মীদের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় শহীদ হারুনের পরিবারের জন্য এই বাড়িটি নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি উপস্থিত নেতাকর্মীদের আহ্বান জানান যেন তারা একইভাবে অন্যান্য শহীদ ও নির্যাতিতার পরিবারের পাশে দাঁড়ান।
ফেনী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহারের সভাপতিত্বে এবং সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলালের সঞ্চালনায় এই সভায় আরও বক্তব্য রাখেন ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক জয়নাল আবেদিন, ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু, নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী আশরাফ উদ্দিন বকুল, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু এবং আমরা বিএনপি পরিবারের সদস্য সচিব মোকছেদুল মোমিন মিথুন।
বক্তব্য শেষে অতিথিরা শহীদ হারুনের পরিবারের জন্য নির্মিত বাড়ির চাবি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন। উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১২ এপ্রিল এই বাড়িটির নির্মাণ কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল। এরপর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী শহীদ হারুনের কবর জিয়ারত করেন এবং নবনির্মিত ঘরটি পরিদর্শন করেন। এ সময় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের শীর্ষস্থানীয় ও তৃণমূল নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ফেনী শহরের শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়কে হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল চলাকালীন পুলিশের গুলিতে হারুনুর রশিদ নিহত হন। তার এই আত্মত্যাগ বিএনপির ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে।





















