সন্তানের জন্ম প্রতিটি পরিবারের জন্য এক অনাবিল আনন্দের মুহূর্ত। এই খুশির বহিঃপ্রকাশ এবং মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য ইসলামি শরিয়তে নির্দিষ্ট কিছু আমলের বিধান রয়েছে। সন্তানের জন্মের পর শুকরিয়া স্বরূপ আল্লাহর নামে ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, গরু, মহিষ কিংবা উট জবেহ করার যে সুন্নত বিধান, তাকেই ইসলামের পরিভাষায় 'আকিকা' বলা হয়। এটি কেবল একটি ধর্মীয় রীতি নয়, বরং নবজাতকের সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশের একটি মাধ্যম।

শরিয়তের নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী, শিশুর জন্মের সপ্তম দিবসে তার মাথার চুল কেটে দিতে হয় এবং আল্লাহর দাসত্ববোধক অর্থ প্রকাশ পায় এমন একটি সুন্দর ও অর্থবহ নাম রাখতে হয়। আকিকার এই ঐতিহ্যের শিকড় অত্যন্ত গভীরে। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া কিতাবের দ্বিতীয় খণ্ডে (ই.ফা.বা. কর্তৃক অনূদিত, পৃষ্ঠা ৪৮৯-৪৯০) বর্ণিত হয়েছে যে, আকিকার বিধান ইসলামপূর্ব যুগেও প্রচলিত ছিল। স্বয়ং হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দাদা আবদুল মোত্তালিব দয়াল রসুলের শুভ জন্মের সপ্তম দিবসে আকিকার অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন এবং তাঁর নাম নির্ধারণ করেন।

আকিকার গুরুত্ব ও পদ্ধতি সম্পর্কে হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। হজরত আলী (রা.) বর্ণনা করেন, ‘রসুল (সা.) ইমাম হাসান (রা.)-এর আকিকার occasion-এ একটি বকরি জবেহ করেন এবং হজরত ফাতিমা (রা.)-কে নির্দেশ দিয়ে বলেন, তার মাথা মুণ্ডন করে দাও এবং সেই চুলের ওজনের সমপরিমাণ রৌপ্য আল্লাহর রাস্তায় সদকা করে দাও।’ হজরত আলী (রা.) আরও উল্লেখ করেন, ‘আমি যখন ওজন করে দেখলাম, তখন তার চুল এক দিরহাম বা এক দিরহামের কিছু অংশ পরিমাণ হলো’ (তিরমিযি শরিফ প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭৮)।

সন্তানভেদে আকিকার পশুর সংখ্যা ভিন্ন হয়। আল্লাহর রসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘পুত্রসন্তানের আকিকায় দুটি এবং কন্যাসন্তানের জন্য একটি ছাগল জবেহ করতে হবে’ (সুনানে নাসায়ি শরিফ দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮৮)। এছাড়া হজরত সালমান ইবনে আমের (রা.) বলেন, ‘আমি আল্লাহর রসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি যে, শিশুর জন্মের সাথে আকিকা জড়িত। সুতরাং তার পক্ষ থেকে তোমরা রক্ত প্রবাহিত করো (অর্থাৎ আকিকার উদ্দেশ্যে পশু জবেহ করো) এবং তার শরীর থেকে কষ্ট দূর করে দাও (অর্থাৎ তার মাথার চুল কেটে দাও)’ (বোখারি শরিফের সূত্রে মেশকাত শরিফ, পৃষ্ঠা ৩৬২)।

আকিকার পশুর ক্ষেত্রে কোরবানির পশুর যাবতীয় শর্ত প্রযোজ্য। যেসব পশু কোরবানির জন্য জায়েজ, আকিকার জন্যও সেগুলোই গ্রহণযোগ্য। সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্য পুত্রসন্তানের ক্ষেত্রে দুটি বকরি, ভেড়া বা দুম্বা জবেহ করা অথবা কোরবানির উপযুক্ত কোনো বড় পশুর এক অংশ প্রদান করা কর্তব্য। তবে সামর্থ্যের অভাব থাকলে একটি বকরি, ভেড়া, দুম্বা অথবা বড় পশুর এক অংশ দিয়েও আকিকা সম্পন্ন করা যাবে। অন্যদিকে, মেয়েশিশুর আকিকার জন্য একটি বকরি, ভেড়া, দুম্বা অথবা বড় পশুর এক অংশ যথেষ্ট। উল্লেখ্য যে, বকরি দ্বারা আকিকা করা সবচেয়ে উত্তম বলে গণ্য হয়। তবে গরু, মহিষ ও উট জবেহ করে একাধিক সন্তানের আকিকা একসাথে করা সম্ভব।

আকিকার পশু জবেহ করার নিয়ম কোরবানির পশুর মতোই। তবে জবেহ করার সময় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয় যে, এটি সন্তানের পক্ষ থেকে আল্লাহর নামে আকিকার পশু হিসেবে জবেহ করা হচ্ছে। সময়set-এর ক্ষেত্রে সপ্তম দিনটি সবচেয়ে সুন্নত। তবে কোনো কারণে সপ্তম দিনে সম্ভব না হলে ১৪ অথবা ২১ তারিখেও এই অনুষ্ঠান করা যায়। এ প্রসঙ্গে রসুল (সা.) বলেছেন, ‘আকিকার পশু সপ্তম দিবসে জবেহ করবে অথবা ১৪ অথবা ২১ তারিখে জবেহ করবে’ (ই.ফা.বা. কর্তৃক অনূদিত ফাতাওয়া ও মাসাইল ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৭৫)।

আকিকার মাংস বণ্টনের নিয়মও কোরবানির মাংসের অনুরূপ। মাংসের এক-তৃতীয়াংশ দরিদ্র ও মিসকিনদের মাঝে দান করা সবচেয়ে উত্তম। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ নিজের ও আত্মীয়-স্বজনের জন্য রাখা যায়। তবে কেউ যদি পুরো মাংস নিজের পরিবারের জন্য রাখে বা মেহমানদারির জন্য ব্যবহার করে, তবে তা জায়েজ হবে, যদিও তা সৌন্দর্যের পরিপন্থী। মাংস কাঁচা অথবা পাক করে বণ্টন করা, কিংবা দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো—সবই শরিয়তে অনুমোদিত (ই.ফা.বা. কর্তৃক অনূদিত ফাতাওয়া ও মাসাইল ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৭৬)।

আকিকা অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাইকে দাওয়াত দিয়ে মিলাদ শরিফ পাঠ করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। এছাড়া আকিকা বা সুন্নতে খাতনার অনুষ্ঠানে শিশুদের যে হাদিয়া বা উপহার দেওয়া হয়, তা পিতা-মাতা সংরক্ষণ করতে পারেন এবং যথাসময়ে তা সন্তানদের ফিরিয়ে দিতে পারেন। আকিকার এই বিস্তারিত বিধানসমূহ ইমাম প্রফেসর ড. আরসাম কুদরত এ খোদা রচিত ‘মোহাম্মদী ইসলামের তালিম’ কিতাবে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আলোচনা করা হয়েছে।