কওমি ধারার সাতটি ইসলামি দলের মধ্যে নতুন করে ঐক্যের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের মধ্যস্থতায় এই দলগুলো ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধভাবে পথচলার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই ঐক্য প্রক্রিয়া দেশের আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণে একটি শক্তিশালী জোটে রূপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামেয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। হেফাজতে ইসলামের আমিরের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সভাটি সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে বেলা ২টা পর্যন্ত চলে। সভায় কওমি ধারার সাতটি প্রধান ইসলামি দল অংশগ্রহণ করে। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে ছিল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। প্রতিটি দল থেকে তিনজন করে প্রতিনিধি এই সভায় অংশ নেন। এছাড়া হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তত ২০ জন শীর্ষ নেতা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে এক সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমান জানান, সাতটি দল ঐক্যবদ্ধভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই ঐক্যের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া ও রূপরেখা নির্ধারিত হবে।
সভায় অংশ নেওয়া একাধিক নেতা উল্লেখ করেন যে, অংশগ্রহণকারী সাতটি দলই মূলত কওমি ধারার। যদিও হেফাজতে ইসলাম একটি অরাজনৈতিক সংগঠন, তবে এর বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হেফাজতের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজনৈতিক দলগুলো যখন ভিন্ন ভিন্ন জোটে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন কওমি অঙ্গনে এক ধরনের বিভক্তি ও অস্থিরতা তৈরি হয়।
নির্বাচনের সেই প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে জানা যায়, তৎকালীন সময়ে খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে আসন সমঝোতায় যায়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গেও সমঝোতার আলোচনা হয়েছিল, তবে শেষ মুহূর্তে দলটি আটটি আসনে এককভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই ভিন্ন ভিন্ন কৌশল কওমি ধারার দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়েছিল।
অন্যদিকে, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ চারটি আসনে সমঝোতার মাধ্যমে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেয়। আবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আসন ভাগাভাগির বিরোধের মুখে জামায়াত জোট ছেড়ে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়। ইসলামী ঐক্যজোটও সেই নির্বাচনে একক প্রার্থী দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। নির্বাচনের পর জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতায় যাওয়া দলগুলোর সঙ্গে হেফাজতের শীর্ষ আলেমদের একাংশের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এক পর্যায়ে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ১১-দলীয় ঐক্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।
এই বিভক্তি দূর করতে এবং কওমি ধারার দলগুলোকে এক ছাতার নিচে আনতে উদ্যোগ নিয়েছেন হেফাজতের আমির। সম্প্রতি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক চট্টগ্রামে গিয়ে হেফাজতের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট করেন যে, জামায়াতের সঙ্গে তাদের পূর্বের ঐক্য আদর্শিক ছিল না, বরং তা ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কৌশল।
হেফাজতের আমিরের মূল লক্ষ্য হলো, কওমি ধারার দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বন্ধ করা। তিনি চান, এই দলগুলো অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভর না করে নিজেদের মধ্যে একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলুক। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রতিটি দলের কাছে লিখিত প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। দলগুলো এখন নিজ নিজ ফোরামে আলোচনা করে তাদের মতামত ও প্রস্তাবনা জমা দেবে।
আগামী আগস্টের শুরুতে এই প্রস্তাবগুলো নিয়ে পুনরায় একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেই সভায় সব দলের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে সম্ভাব্য ঐক্যের চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়নের চেষ্টা করা হবে। কওমি অঙ্গনের এই সম্ভাব্য ঐক্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।











