দয়াময় স্রষ্টার এই নিখুঁত আয়োজন মূলত মানবজাতির কল্যাণ এবং সামগ্রিক বিশ্বজগতের শান্তির জন্যই। তিনি এই বিশাল মহাবিশ্বের একমাত্র অভিভাবক ও পালনকর্তা। পাহাড়ের উচ্চতা থেকে শুরু করে নদীর গতিপথ কিংবা গভীর সাগরতলের প্রতিটি ক্ষুদ্র প্রাণীর খবর তিনি অতি কাছ থেকে রাখেন। পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্ট জীব দিনরাত তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা ও তসবিহ পাঠে মগ্ন থাকে।
পবিত্র আল কোরআনের সূরা মুলক-এর ১৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, 'তারা কি লক্ষ্য করে না, তাদের মাথার ওপর উড়ন্ত পাখিদের প্রতি—তারা কখনো ডানা বিস্তার করে এবং কখনো ডানা সংকুচিত করে? রহমান আল্লাহই তাদের স্থির রাখেন। তিনি সব বিষয় দেখেন।' একইভাবে সূরা তাগাবুন-এর প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে, 'নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করে। রাজত্ব এবং প্রশংসা কেবল তাঁরই। তিনি সব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।'
এই অমোঘ সত্যের আলোকে বোঝা যায়, যে কোনো জীবকে অকারণে কষ্ট দেওয়া মানে পরোক্ষভাবে মহান স্রষ্টার সৃষ্টিকে আঘাত করা। পক্ষান্তরে, কোনো প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শন করা মানে স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা। আর যে ব্যক্তি স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি দয়া ও মমতা প্রদর্শন করে, রাব্বুল আলামিন তার জন্য অসীম করুণার ভাণ্ডার খুলে দেন।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, 'অনুগ্রহকারীদের প্রতি পরম করুণাময় আল্লাহ অনুগ্রহ করে থাকেন। তোমরা দুনিয়াবাসীর ওপর অনুগ্রহ কর, তবে আসমানে অবস্থানকারী আল্লাহ তোমাদের ওপর অনুগ্রহ করবেন।' (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
সৃষ্টির প্রতি এই মমত্ববোধের গুরুত্ব বোঝাতে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত আরেকটি ঘটনা অত্যন্ত শিক্ষণীয়। একদা নবীদের মধ্যে একজন নবীকে একটি পিঁপড়া কামড়ালে, তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে পিঁপড়ার পুরো বস্তিটি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং তা কার্যকর করা হয়। এরপর মহান আল্লাহ তাঁর কাছে ওহি পাঠ করে সতর্ক করেন যে, 'তোমাকে একটি পিঁপড়া কামড়ালো বলে তুমি আল্লাহর প্রশংসাকারী একটি পুরো উম্মতকেই পুড়িয়ে ফেললে!' (বুখারি, মুসলিম)।
যারা নিঃস্বার্থভাবে সৃষ্ট জীবের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করে, দয়াময় প্রভু তাদের প্রতি ক্ষমার হাত প্রসারিত করেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) আরও বর্ণনা করেন যে, রসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তির কথা বলেছেন যিনি অত্যন্ত পিপাসার্ত হয়ে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। সামনে একটি কুয়া দেখতে পেয়ে তিনি তাতে নেমে পানি পান করেন। কুয়া থেকে উঠে তিনি লক্ষ্য করেন, একটি কুকুর পিপাসায় কাতর হয়ে জিব বের করে কাদামাটি চাটছে। লোকটি তাৎক্ষণিকভাবে উপলব্ধি করলেন যে, তার পিপাসার কষ্টটি এই কুকুরটির ক্ষেত্রেও সমান। দয়ার তাড়নায় তিনি পুনরায় কুয়ায় নেমে নিজের পায়ের মোজায় পানি ভরে ওপরে নিয়ে এলেন এবং কুকুরটিকে পান করালেন। তাঁর এই সামান্য অথচ নিঃস্বার্থ দয়ার কারণে আল্লাহ তাকে পুরস্কৃত করলেন এবং তার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিলেন।











