মো পজিরুল ইসলাম , ঠাকুরগাঁও:
ঠাকুরগাঁও জেলাজুড়ে সম্প্রতি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে সাপের উপদ্রব। বসতবাড়ি, ফসলের মাঠ কিংবা চলাচলের রাস্তা—সবখানেই এখন যেন বিষধর সাপের ভয়াল থাবা। গত কয়েক সপ্তাহে জেলার বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকজন সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। ফলে পুরো জেলাজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিশেষজ্ঞরা সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন।
বর্ষা ও গরমই কি কারণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং তীব্র গরমের কারণে সাপের উপদ্রব স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। অতিরিক্ত পানির কারণে খোলস বদলানো এবং খাবারের খোঁজে সাপ উঁচু ও শুষ্ক জায়গায় আশ্রয় নেয়। ঠাকুরগাঁওয়ের গ্রামগুলোতে সাধারণত ঝোপঝাড়, পুরনো কাঠের স্তূপ, ইটের পাঁজা এবং মাটির ঘরের গর্তে সাপের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
কৃষকদের জন্য বর্তমান সময়টি অত্যন্ত ঝুঁকির হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোরে বা রাতে ধানক্ষেত ও অন্যান্য ফসলি জমিতে কাজ করতে গিয়ে অনেকেই সাপের মুখোমুখি হচ্ছেন। জেলা সদর ছাড়াও পীরগঞ্জ, রানীশংকৈল, বালিয়াডাঙ্গী ও হরিপুর উপজেলার গ্রামাঞ্চলে সাপের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে।
অ্যান্টিভেনম ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা
ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালসহ প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাপের কামড়ের চিকিৎসা রয়েছে কিনা তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন ছিল। তবে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে অ্যান্টিভেনম (Anti-venom) মজুত রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীদের ওঝা বা কবিরাজের কাছে নিয়ে সময় নষ্ট না করে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে আনা জরুরি। কারণ সঠিক সময়ে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করতে পারলে আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন বাঁচানো শতভাগ সম্ভব।
সাপ থেকে সুরক্ষায় সাধারণ মানুষের জন্য জরুরি পরামর্শ
ঠাকুরগাঁও স্বাস্থ্য বিভাগ ও সচেতন মহল থেকে সর্বসাধারণের সুরক্ষায় নিম্নলিখিত নির্দেশনাগুলো মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে:
আলোকস্বল্পতা এড়িয়ে চলুন: রাতে বা অন্ধকারে চলাচলের সময় অবশ্যই শক্তিশালী টর্চলাইট ব্যবহার করুন।
বিছানা পরীক্ষা করুন: রাতে ঘুমানোর আগে বিছানা, বালিশ এবং মশারি ভালো করে ঝেড়ে নিন। মশারি টাঙিয়ে ঘুমানো সবচেয়ে নিরাপদ।
বসতবাড়ি পরিষ্কার রাখুন: ঘরের চারপাশের ঝোপঝাড়, জমে থাকা আবর্জনা, খড় ও কাঠের স্তূপ নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
সাবধানতা অবলম্বন: জুতো বা বুট পরার আগে ভেতরটা পরীক্ষা করে নিন। ফসলের মাঠে কাজ করার সময় লম্বা বুট জুতো এবং শক্ত গ্লাভস ব্যবহার করা ভালো।
সাপের গর্ত বন্ধ করুন: বাড়ির আশপাশে বা মাটির দেওয়ালে সাপের থাকার উপযোগী গর্ত থাকলে তা দ্রুত মাটি বা সিমেন্ট দিয়ে বন্ধ করে দিন।
সাপে কাটলে কী করবেন, আর কী করবেন না?
সাপে কাটলে আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে নিচের নিয়মগুলো অনুসরণ করা জরুরি:
আক্রান্ত অঙ্গটি স্থির ও নাড়াচাড়া বন্ধ রাখুন। | কামড়ের স্থান শক্ত করে দড়ি বা বাঁধন দিয়ে বাঁধবেন না। |
আক্রান্ত স্থান সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে দিন। | কামড়ের জায়গায় কোনো ধরনের ব্লেড বা ছুরি দিয়ে কাটা যাবে না। |
রোগীকে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। | ওঝা, ঝাড়ফুঁক বা কোনো কবিরাজি চিকিৎসার পেছনে সময় নষ্ট করবেন না। |
সাপ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও বিষধর সাপ মানুষের জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই আতঙ্কিত না হয়ে ঠাকুরগাঁওবাসীকে সচেতনতা ও সতর্কতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। মনে রাখবেন, **সচেতনতাই সাপের কামড় থেকে আত্মরক্ষার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।






