প্রাক্তন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বর্তমান মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন গ্রহণ, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়োগে কোটি কোটি টাকার লেনদেন এবং বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে বিস্তারিত অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুদকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) তানজির আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, যথাযথ প্রক্রিয়ায় অভিযোগটি গ্রহণ করে তা খতিয়ে দেখার কাজ শুরু করেছে কমিশন।
দুদকে জমা দেওয়া একটি আনুষ্ঠানিক আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে আসিফ মাহমুদ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এবং কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার বাণিজ্যের সঙ্গে তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, প্রশাসনিক নিয়োগেও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগের বিনিময়ে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং সারা দেশে ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতি পদের জন্য ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন করা হয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সেতু নির্মাণ প্রকল্পগুলোর ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়। এছাড়া ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালেও নিয়োগ, বদলি এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির নিয়োগের বিনিময়ে মোটা অঙ্কের উৎকোচ গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন— ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামের নিয়োগের বিনিময়ে ১০ কোটি টাকা, এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে নিয়োগের বিনিময়ে ৫২ কোটি টাকা এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য ৬৫ কোটি টাকা ঘুষ হিসেবে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
আসিফ মাহমুদের বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। তিনি রাষ্ট্রীয় কাজে হেলিকপ্টারে ভ্রমণ করে সরকারি অর্থের অপচয় করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া রাজধানীর পাঁচ তারকা হোটেল ওয়েস্টিনসহ বিভিন্ন অভিজাত হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস এবং উচ্চমূল্যের গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টিও দুদকের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি হলো বিদেশে অর্থ পাচার। অভিযোগ অনুযায়ী, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রাখা হয়েছে। পাচারের অংকগুলো চমকপ্রদ— দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করে সেখানে বিলাসবহুল ভিলা ক্রয় এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই অর্থ পাচারের প্রক্রিয়ায় তার দুই বোনজামাই এবং এক ভাগ্নের সহায়তা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আঞ্চলিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। নিজ উপজেলা মুরাদনগরের জন্য গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। ওই বরাদ্দের প্রক্রিয়া এবং তা গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে যে, আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন এবং এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহ করতেন। এছাড়া তার পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঘুষ লেনদেনে মধ্যস্থতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ওঠা এই সব অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান চলমান। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে অভিযোগটি দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে যাতে আরও নিবিড়ভাবে তদন্ত করা যায়।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। ছাত্র প্রতিনিধিদের একজন হিসেবে আসিফ মাহমুদ উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দেন। শুরুতে তিনি যুব ও ক্রীড়া এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের নভেম্বরে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। তবে ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দেন। বর্তমানে তিনি ওই দলটির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

















