ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) সেবা প্রদান প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্যে এর সামগ্রিক কার্যক্রমকে ব্যাপক মাত্রায় ডিজিটাল রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে সেবার মানোন্নয়নের এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংস্থাটির পণ্য বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে যাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ভিত্তিক রিয়েল-টাইম মনিটরিং সিস্টেম। এর পাশাপাশি সাধারণ উপকারভোগীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে একটি বিশেষ এআই-ভিত্তিক কন্টাক্ট সেন্টার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) টিসিবির সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত ‘ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এই যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান।

অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, স্বল্প আয়ের মানুষের দোরগোড়ায় ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে টিসিবির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে টিসিবির সেবায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারি ভর্তুকির সুবিধাগুলো যেন প্রকৃত ও যোগ্য উপকারভোগীদের কাছেই পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

প্রকৃত উপকারভোগীদের চিহ্নিত করার বিষয়ে মন্ত্রী জানান, জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্যের কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রায় ৫৯ লাখ অযোগ্য আবেদনকারীকে তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। এর ফলে একটি সম্পূর্ণ যাচাইকৃত ডিজিটাল ডেটাবেস তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, যা সরকারি ভর্তুকির অপচয় রোধে এবং সঠিক মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি আরও জানান, বর্তমানে প্রায় ৭৯ লাখ মানুষ টিসিবির সেবার আওতায় রয়েছেন এবং ভবিষ্যতে এই সংখ্যা এক কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

উপকারভোগীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে অনুষ্ঠানে নতুন একটি মোবাইল অ্যাপ চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। টিসিবির এই নতুন অ্যাপটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘উপকারী’। এই অ্যাপের মাধ্যমে উপকারভোগীরা প্রচলিত কার্ডের পাশাপাশি একটি নিরাপদ ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। অ্যাপটিতে ডিজিটালি স্বাক্ষরিত এবং এনক্রিপ্টেড কিউআর (QR) কোডের ব্যবস্থা থাকবে, যার মাধ্যমে উপকারভোগীর পরিচয় এবং পণ্য পাওয়ার যোগ্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা যাবে। এর ফলে কার্ড হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হয়ে গেলেও প্রকৃত উপকারভোগীরা আর পণ্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন না।

পণ্য বিতরণের পাশাপাশি ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা জানানো হয়েছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি অনলাইন ডিলার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে ডিলার আবেদন, তথ্য সংরক্ষণ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক করা হবে। যদি আবেদনের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হয়, তবে ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে ডিলার নির্বাচন করা হবে। এছাড়া আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অনলাইন পেমেন্ট কালেকশন ব্যবস্থা চালু করা হবে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে জানানো হয়, অদূর ভবিষ্যতে একটি ‘অল-ইন-ওয়ান’ পিওএস (POS) সিস্টেম চালু করা হবে। এর মাধ্যমে পণ্য বিক্রি, বায়োমেট্রিক যাচাই, অনলাইন পেমেন্ট এবং তাৎক্ষণিক বিক্রয় রশিদ প্রদানের কাজ এক জায়গাতেই সম্পন্ন হবে। একইসঙ্গে এআই-ভিত্তিক রিয়েল-টাইম মনিটরিং সিস্টেমের মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় কতটুকু পণ্য বিক্রি ও বিতরণ হচ্ছে এবং কোথাও কোনো অনিয়ম হচ্ছে কি না, তা কেন্দ্রীয়ভাবে তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। এতে অনিয়ম শনাক্ত করা এবং দ্রুত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সহজ হবে। পাশাপাশি এআই-ভিত্তিক কন্টাক্ট সেন্টারের মাধ্যমে উপকারভোগীরা দ্রুত তাদের সমস্যার সমাধান এবং প্রয়োজনীয় তথ্য পাবেন।

সার্বিকভাবে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টিসিবির ভর্তুকি ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, চলতি অর্থবছরে ডিজিটাল রূপান্তরের ফলে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকার ভর্তুকি সাশ্রয় হতে পারে। আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রযুক্তির পূর্ণ প্রয়োগের মাধ্যমে ভর্তুকির অপচয় আরও বড় পরিসরে কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও টিসিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।