জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এক ঐতিহাসিক রায়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এই রায়ের পর উল্লাসে ফেটে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। এই যুগান্তকারী রায়ের খুশিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) পুরো ক্যাম্পাসে মিষ্টি বিতরণ করে আনন্দ উদযাপন করে।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারিক প্যানেল এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের রায়ে মামলার সাত আসামির প্রত্যেকের জন্যই মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত হয়েছে। রায় ঘোষণার পরপরই ক্যাম্পাসে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদ এবং সমাজসেবা সম্পাদক এবি জোবায়ের (জুবায়ের বিন নেসারী)র নেতৃত্বে একটি দল পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে শিক্ষার্থী, পথচারী এবং রিকশাচালকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে মিষ্টি বিতরণ করেন। এই মিষ্টি বিতরণের মাধ্যমে তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ন্যায়বিচারের জয় উদযাপন করেন বলে জানান।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের তালিকায় রয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। এছাড়া মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ এবং সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের। উল্লেখ্য, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।

মঙ্গলবার দুপুর সোয়া ১২টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হিসেবে ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রায়ে কেবল মৃত্যুদণ্ডই নয়, বরং ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ এবং মাইনুল হোসেন খানের মোট সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার কঠোর আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বাজেয়াপ্ত করা এই বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার এবং আহতদের মাঝে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মামলাটির আইনি প্রক্রিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১৮ জুন এই মামলার তদন্ত শুরু হয়। দীর্ঘ ও নিবিড় তদন্ত কার্যক্রম শেষে একই বছরের ৭ ডিসেম্বর তদন্ত কর্মকর্তারা চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেন। এরপর যথাযথ যাচাই-বাছাই শেষে ১৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল-২-এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয় এবং একই দিনে ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নেন। পরবর্তীতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং স্টেট ডিফেন্স নিয়োগের মতো বিভিন্ন আইনি ধাপ সম্পন্ন হয়। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করার আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

১৭ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য এবং প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করেন। এই সাক্ষ্যতালিকার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল শহীদ শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর আগে দেওয়া জবানবন্দি। গত ২ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হয় এবং ৪ আগস্ট থেকে প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শুরু হয়। টানা ৯ কার্যদিবসের শুনানি শেষে ১৭ আগস্ট প্রসিকিউশন ও স্টেট ডিফেন্সের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। ওই দিনই মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয় এবং ১৫ সেপ্টেম্বর রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারিত হয়।

মামলাটিতে মোট ১২৩টি সিরিজ ডকুমেন্ট প্রমাণ হিসেবে প্রদর্শন করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে আসামিরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সমন্বিত নির্দেশ দিয়েছেন এবং প্ররোচনামূলক ও উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করেছেন। তারা দলীয় নেতাকর্মীদের রাজপথে নামিয়ে সহিংস প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং একাধিক গোপন বৈঠকে সহিংসতার নীল নকশা তৈরি করেন। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র হামলা পরিচালনা, কঠোর দমন-পীড়ন এবং গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব পরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের ফলে দেশজুড়ে ব্যাপক হত্যা, হত্যাচেষ্টা এবং চরম সহিংসতা সংঘটিত হয়েছে।

এর আগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গত বছরের ১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সেই রায়ের প্রায় ১০ মাস পর দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ এই সাত শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হলো।