দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে কোনো বাংলাদেশিকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়—এমন সাহসী ও জোরালো দাবি জানিয়েছেন ফাহাম আবদুস সালাম। তাঁর মতে, একজন মানুষের দেশপ্রেম বা আনুগত্য পরিমাপের মাপকাঠি হিসেবে হাতে থাকা পাসপোর্টের সংখ্যা কখনোই বড় কোনো বিষয় হতে পারে না। বুধবার (২৬ আগস্ট) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত এক দীর্ঘ ও বিশ্লেষণধর্মী পোস্টে তিনি এই মতামত ব্যক্ত করেন।
ফাহাম আবদুস সালাম তাঁর পোস্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, একজনের কাছে একটি, দুটি বা তিনটি পাসপোর্ট থাকলেই তাঁর দেশপ্রেম কমে যায় বা বাড়ে, এমন ধারণার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। তিনি যুক্তি দেখান, একজন মানুষ একটি পাসপোর্ট থাকা সত্ত্বেও যেভাবে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে, সেক্ষেত্রে দুটি পাসপোর্ট থাকলে সেই বিশ্বাসঘাতকতার প্রবণতা খুব একটা কমবে বলে মনে করাটা ভুল। তাঁর মতে, বাস্তব জীবনে মানুষের স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও সমন্বয় মূলত ব্যক্তিগত স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, পাসপোর্টের সংখ্যার ওপর নয়। তাই কেবল নাগরিকত্বের দলিলাদি দিয়ে কারো আনুগত্য নির্ধারণ করা বাস্তবসম্মত বা যৌক্তিক কোনো পদক্ষেপ নয়।
এই আলোচনার প্রেক্ষিতে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রসঙ্গটি তুলে ধরেন। ফাহাম বলেন, তারেক রহমান দীর্ঘ সময় লন্ডনে অবস্থান করলেও অত্যন্ত সচেতনভাবে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ধরে রেখেছেন। তাঁর বিশ্বাস, দেশের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখেই তারেক রহমান এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন ধরে নেওয়া হবে যে অন্য প্রবাসীরা তারেক রহমানের মতো দেশপ্রেমী হবেন না? কেন তাঁরা বাংলাদেশে ফিরে এসে দেশের জন্য কাজ করবেন না? শুধুমাত্র দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে কেন তাঁদের জন্য বিষয়টি নেতিবাচক হিসেবে গণ্য হবে, তা নিয়ে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাস্তব জীবন ও সংগ্রামের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতে বসবাসরত অনেক বাংলাদেশি সেখানে উচ্চ হারে কর প্রদান করেন। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে তাঁরা সেসব দেশে স্বাস্থ্যসেবা এবং বিভিন্ন সামাজিক সুবিধার আইনি অধিকার অর্জন করেন। এমতাবস্থায়, রাজনীতিতে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে ফেরার আগে নাগরিকত্ব ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি তাঁদের জন্য এক বিশাল ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বৃদ্ধ বয়সে উন্নত চিকিৎসা সেবা পাওয়ার সুযোগ এবং সন্তানদের সাথে দেখা করার সুবিধা হারানোর আশঙ্কা অনেক প্রবাসীকে নাগরিকত্ব ধরে রাখতে বাধ্য করে। ফাহাম জোর দিয়ে বলেন, এর পেছনে কোনো গভীর বা রহস্যময় ‘গ্র্যান্ড ষড়যন্ত্রতত্ত্ব’ নেই, বরং এটি সম্পূর্ণ মানবিক ও বাস্তবসম্মত জীবনসংগ্রামের অংশ।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী জনগোষ্ঠীর গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান প্রদান করেন। তাঁর মতে, প্রায় ৭০ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১০ লাখ মানুষ কাজের সন্ধানে বা উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে পাড়ি জমাচ্ছেন। রেমিট্যান্সের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বছরে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্রবাসীদের দেশের ‘ক্রুড অয়েল’ বা খনিজ তেলের সাথে তুলনা করে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন যে, দেশের অর্থনীতিতে তাঁদের অবদান এত বিশাল হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের জন্য বৈষম্যমূলক আইন থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক।
দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রচলিত আইনের কঠোর সমালোচনা করে ফাহাম আবদুস সালাম বলেন, দুই দেশের নাগরিকত্ব থাকলে কারো আনুগত্য ভাগ হয়ে যাবে কিংবা অপরাধ করে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া সহজ হবে—এমন ধারণা সম্পূর্ণ বাস্তবতাবর্জিত। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, কেউ পাসপোর্টের কারণে বিশ্বাসঘাতকতা করে না, বরং মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই তার কাজের প্রতিফলন ঘটায়। সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বর্তমান আইন বাতিলের প্রস্তাব দেন। বিকল্প হিসেবে তিনি প্রস্তাব করেন, কোনো প্রার্থী কোন কোন দেশের নাগরিকত্ব ধারণ করেন, তা নির্বাচনের আগে প্রকাশ্যে ঘোষণা করা বাধ্যতামূলক করা হোক। যদি কেউ এই তথ্য গোপন করেন বা মিথ্যা ঘোষণা দেন, তবে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল এবং নির্বাচিত হলে এমপি পদ বাতিলের কঠোর বিধান রাখা যেতে পারে।
পরিশেষে তিনি বলেন, কোনো ভোটারের যদি মনে হয় দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা একজন প্রার্থী তাঁর এলাকার জন্য উপযুক্ত নন, তবে তিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাঁকে ভোট না দিয়ে তাঁর মতামত প্রকাশ করতে পারেন। তবে আইনিভাবে কাউকে তাঁর রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। ফাহামের ভাষায়, অন্য কোনো দেশের পাসপোর্ট থাকলেই কেউ কম বাংলাদেশি হয়ে যান না।
















