রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য এক চরম চ্যালেঞ্জ এবং অন্যতম বড় সংকট হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জাপান সরকারের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত এবং নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়ার সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন এই বৈঠকের বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেছেন।
বৈঠককালে ইয়োহেই সাসাকাওয়া তার দীর্ঘ পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, গত ৫০ বছর ধরে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্য নিরসনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে মিয়ানমার ইস্যুতে জাপান সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে তার বর্তমান ভূমিকা এবং দায়িত্ব সম্পর্কে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বিস্তারিত অবহিত করেন। রোহিঙ্গা সংকটের ফলে বাংলাদেশের ওপর যে বিশাল চাপ তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি গভীর সচেতনতা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা প্রদান এবং এই সংকট মোকাবিলায় জাপান সরকারের বিভিন্ন অনুদান ও সহযোগিতার বিষয়টি তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশেষ দূতকে বাংলাদেশ সফরের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান এবং তার দীর্ঘদিনের মানবিক কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এমনিতেই একটি অত্যন্ত জনবহুল দেশ। দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার ফলে দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সংকট এখন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার প্রভাব দেশের বিভিন্ন স্তরে অনুভূত হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী জাপানের বিশেষ দূতের প্রতি বিশেষ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, প্রত্যাবাসনের পর মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, রোহিঙ্গারা যদি তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে, তবে সেখানে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের প্রকৃত সুযোগ তৈরি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান আনবে।
জাপানের বিশেষ দূত জানান, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে তার সঙ্গে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের আলোচনা হয়েছে। তার মতে, মিয়ানমার সরকার এই সংকটের সমাধানে আন্তরিক। তবে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, রাখাইন প্রদেশের বর্তমান জটিল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না এবং এতে কিছুটা সময় লাগছে।
বৈঠকে কেবল দ্বিপক্ষীয় প্রচেষ্টায় সীমাবদ্ধ না থেকে, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে বহুপক্ষীয় উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। উভয় পক্ষই একমত হন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ দূতকে বাংলাদেশে একটি আধুনিক ভ্যাকসিন উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানান। বিশেষ দূত এই প্রস্তাবের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং বিষয়টি নিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া, বাংলাদেশ জাপানের সরাসরি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে আগ্রহী এবং এই লক্ষ্যে সরকার দেশে একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে বলে প্রধানমন্ত্রী তাকে জানান। একই সাথে, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও উন্নত ও কার্যকর করার বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী তার আগ্রহ ব্যক্ত করেন।
এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান।
















