রাজধানীর পশ্চিম রামপুরায় সড়ক ও নর্দমা উন্নয়নের কাজ মাঝপথে থেমে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। জানা গেছে, সন্ত্রাসীদের ২০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে না পারায় এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়া রাস্তায় প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অধীনে পশ্চিম রামপুরার এই সড়ক ও পাইপ নর্দমা উন্নয়নের কাজ পরিচালনা করছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আলিফ ট্রেডার্স। তবে প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে দানা বাঁধে এক অন্ধকার ছায়া। গত ২০ জুন শান্ত নামের এক ব্যক্তি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কাছে ফোন করে নিজেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের ছোট ভাই হিসেবে পরিচয় দেন। এরপরই শুরু হয় মোটা অঙ্কের চাঁদার দাবি। দাবি অনুযায়ী ২০ লাখ টাকা না দেওয়ায় গত আগস্ট মাসে অন্তত দুই দফায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ওপর নৃশংস হামলা চালানো হয়। স্থানীয় সন্ত্রাসীদের এই ধারাবাহিক হামলা ও হুমকির মুখে কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়লে, একপর্যায়ে কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় মেসার্স আলিফ ট্রেডার্স।

ডিএনসিসির ২২ নম্বর ওয়ার্ডের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি। এরপর ২১ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু হয় এবং নির্ধারিত সময়সূচী অনুযায়ী আগামী ১৭ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু সন্ত্রাসীদের হামলা, মূল্যবান যন্ত্রপাতি ভাঙচুর এবং বেশ কয়েকজন শ্রমিকের আহত হওয়ার ঘটনায় পুরো প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়।

প্রকল্পটির আওতাভুক্ত এলাকাটি পশ্চিম রামপুরা ওয়াসা পানির পাম্প থেকে শুরু হয়ে বিভিন্ন হোল্ডিং হয়ে ওয়াপদা রোড বাইলেন পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়া ঝীলকানন রোড বাইলেন এবং নাসিরেরটেক এলাকাও এই উন্নয়ন কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পুরো এলাকায় পরিকল্পিতভাবে সড়ক ও নর্দমা সংস্কারের কথা থাকলেও বর্তমানে তা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আলিফ ট্রেডার্সের দাবি, প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছিল এবং মাটি সরানোর কাজও প্রায় সম্পন্ন হয়ে এসেছিল। কিন্তু হঠাৎ করে সন্ত্রাসীদের চাঁদা দাবি ও প্রাণঘাতী হামলার মুখে কাজ এগিয়ে নেওয়া দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। এদিকে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ডিএনসিসির আঞ্চলিক কার্যালয় (অঞ্চল-৩, মহাখালী) থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিকে একটি কঠোর সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আলমের স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কাজে ধীরগতি এবং চরম অবহেলার অভিযোগ আনা হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সরেজমিনে সাইট পরিদর্শনে দেখা গেছে কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ। এছাড়া উত্তোলিত মাটি, রাবিশ ও বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী যত্রতত্র ফেলে রাখা হয়েছে, যার ফলে পথচারী ও যানবাহন চলাচলে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ডিএনসিসি দ্রুত মাটি ও আবর্জনা অপসারণের পাশাপাশি দক্ষ জনবল বাড়িয়ে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেয়।

এই সংকটের মুখে মেসার্স আলিফ ট্রেডার্স ডিএনসিসির নির্বাহী প্রকৌশলীর বরাবর একটি লিখিত আবেদন জমা দেয়। সেখানে সন্ত্রাসী হামলার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। একইসঙ্গে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে ডিএনসিসির নির্বাহী প্রকৌশলীর বিশেষ সহায়তা কামনা করে সংস্থাটি। প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে কর্মীদের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে কাজ পুনরায় শুরু করা এবং তা নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করা সম্ভব হবে না।

বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে ঠিকাদার ফিলিপস এশিয়া পোস্টকে জানান, গত ২০ জুন শান্ত নামের এক ব্যক্তি তাকে ফোন করে সরাসরি হুমকি দেন। নিজেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের ভাই হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, ‘জানেনই তো আমরা কারা, আমাদের টাকা না দিলে এখানে কাজ করা হবে না।’ ফিলিপস জানান, ওই ফোনকলের পর আগস্টে দুই দফায় কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়। কর্মীদের জীবন বাঁচাতে তিনি কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হন, কারণ তার কাছে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ছিল সবচেয়ে অগ্রাধিকারযোগ্য বিষয়।

তবে এই পুরো সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে পড়েছেন এলাকার সাধারণ মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় রাস্তাঘাটের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে। পশ্চিম রামপুরা এলাকার মানুষের চলাচলে চরম দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে, যা এখন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিস্থিতির দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের জোরালো দাবি উঠেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।

সমস্যার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে ঠিকাদার ফিলিপস বলেন, ‘দলের লোক তো আর এখানে আসে না, এখন আসে ইন্টারন্যাশনাল মাফিয়া। বিদেশ থেকে ফোন দিয়ে হুমকি দেয়। তবে আমরা সেই হুমকি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। এবার দেখি দেশি-বিদেশি কারা আসে। আমরা ইনশাআল্লাহ কাজ করব। আগামীকাল (মঙ্গলবার) সকাল থেকেই পুনরায় কাজ শুরু হবে; লোকজন ইতিমধ্যে সাইটে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। সন্ত্রাসীরা চাঁদা চায়, ঝামেলা করে, তার মধ্যেও অনেক কাজ হয়েছে। কিন্তু মাঝপথে বাধ্য হয়ে বন্ধ করতে হয়েছিল।’

তিনি আরও আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, ‘মানুষের যে কষ্ট হচ্ছে, তা আমারও মনে লাগে। কত বৃদ্ধ মানুষ নামাজ পড়তে যাবেন, কিন্তু রাস্তার বেহাল দশায় যেতে পারছেন না, অনেকে খালে পড়ে যাচ্ছেন। আমিও মানুষ, কষ্ট লাগে। আমরা কাজ ফেলে রাখার লোক নই।’

সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ রাকিবুল হাসান এশিয়া পোস্টকে জানান, ‘আমরা এ ধরনের একটি অভিযোগ পেয়েছি, তবে এর সত্যতা নিয়ে আমাদের মনে সংশয় আছে। এই এলাকায় অন্যান্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও কাজ করছে, তাহলে কেবল তাদেরই (আলিফ ট্রেডার্স) কেন সমস্যা হচ্ছে, সেটি প্রশ্নবিদ্ধ। এমন ঘটনা ঘটে থাকলে তারা পুলিশের সহায়তা নিয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে যদি ঠিকাদারের গাফিলতি প্রমাণিত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’