৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে দিবস। এই বিশেষ দিনে গুমের শিকার সকল ব্যক্তি এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সংহতি ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। শনিবার (২৯ আগস্ট) দলটির সহ-দপ্তর সম্পাদক মুহাম্মদ মুনির হোসেন স্বাক্ষরিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তিনি এই আহ্বান জানান। বিবৃতিতে রিজভী বিগত বছরগুলোতে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের যাঁদের ওপর নেমে এসেছিল, সেই সকল গুমের শিকার ব্যক্তিদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।

বিবৃতিতে রুহুল কবির রিজভী অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন, গুম কেবল একজন মানুষকে তার পরিবার ও সমাজ থেকে রহস্যজনকভাবে অদৃশ্য করে দেওয়া নয়; বরং এটি মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং জীবনধারণের অধিকারের ওপর এক নির্মম ও অমানবিক আঘাত। বছরের পর বছর প্রিয়জনের ফিরে আসার ক্ষীণ আশায় বেঁচে থাকা, ভাগ্য সম্পর্কে চরম অনিশ্চয়তা এবং সত্য জানার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার যে অসহনীয় মানসিক ও আত্মিক যন্ত্রণা—তা কোনো সুস্থ পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং অনিশ্চয়তা কেবল একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য এক গভীর ক্ষত এবং দীর্ঘস্থায়ী ট্রমা।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে গুমকে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং ভিন্নমত স্তব্ধ করার এক ভয়াবহ ও পরিকল্পিত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, মানবাধিকারকর্মী এবং মুক্তচিন্তার ভিন্নমতাবলম্বীসহ বহু মানুষ এর শিকার হয়েছেন। অনেক পরিবার আজও অন্ধকারে ডুবে আছে; তারা জানে না তাদের প্রিয়জন কোথায় আছেন, কী অবস্থায় আছেন কিংবা আদৌ তারা কোনোদিন ফিরে আসবেন কি না। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং নীরবতা আমাদের জাতীয় বিবেকের সামনে এক গভীর নৈতিক দায় হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি জানান, দলটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে গুমের প্রতিটি ঘটনার পেছনের সত্য উদঘাটন, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত এবং এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একমাত্র ও অপরিহার্য শর্ত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। একই সঙ্গে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সত্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

একটি ভবিষ্যৎমুখী ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বিবৃতিতে বলা হয়, বিএনপি এমন একটি দেশ গড়ে তুলতে চায় যেখানে রাষ্ট্রের কোনো সংস্থা আর কখনো সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে গুমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার দুঃসাহস দেখাবে না। যেখানে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনী থাকবে সম্পূর্ণ জবাবদিহির আওতায় এবং রাজনৈতিক পরিচয় বা মতভিন্নতার কারণে কোনো নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা কোনোভাবেই বিপন্ন হবে না। আইনের শাসন হবে সবার জন্য সমান এবং সেখানে মানবাধিকার হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

রিজভী বলেন, "আর কোনো গুম নয়, আর কোনো পরিবারকে অনন্ত অপেক্ষায় থাকতে হবে না।" যারা এখনও নিখোঁজ, তাদের প্রত্যেকের বর্তমান অবস্থান ও ভাগ্য সম্পর্কে সত্য প্রকাশ করতে হবে। যারা ফিরে এসেছেন, তাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আর যারা আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না, তাদের পরিবার যেন সত্যের স্বীকৃতি ও যথাযথ বিচার পায়—রাষ্ট্রকে তা নিশ্চিত করতে হবে। বিবৃতিতে গুমের শিকার সকল ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতি পুনরায় গভীর শ্রদ্ধা ও সংহতি জানিয়ে তিনি আশ্বাস দেন, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার যে দীর্ঘ সংগ্রাম, সেই সংগ্রামে বিএনপি সর্বদা তাদের পাশে থাকবে।