রাতে প্রশান্তির ঘুম না হওয়ার পেছনে আমরা সাধারণত দুশ্চিন্তা, স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার কিংবা চা-কফির মতো ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়কেই দায়ী করি। তবে ঘুমের মানের ওপর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রভাব ফেলে, যা আমরা অনেক সময় এড়িয়ে যাই—আর তা হলো আমাদের রাতের খাবার। রাতের মেনুতে কী থাকছে এবং কখন তা খাওয়া হচ্ছে, তা সরাসরি আমাদের ঘুমের গভীরতা ও স্থায়িত্বকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে কোনো খাবার খাওয়ার পর যদি গ্যাস, পেটফাঁপা, বদহজম কিংবা পাকস্থলীতে অস্বস্তি তৈরি হয়, তবে সেই শারীরিক অস্বস্তির কারণে মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যেতে পারে, যা পরদিন আমাদের কর্মক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়।

সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো, আমরা যে খাবারগুলোকে অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর বলে মনে করি, ঘুমানোর ঠিক আগে সেগুলো খেলেও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে, ওই খাবারগুলো অস্বাস্থ্যকর; বরং শরীরের প্রতিক্রিয়া ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। মূল বিষয়টি হলো, কোন নির্দিষ্ট খাবারটি আপনার শরীরে অস্বস্তি তৈরি করছে এবং আপনি সেটি দিনের কোন সময়ে গ্রহণ করছেন।

ব্রকলি, ফুলকপি ও বাঁধাকপির মতো সবজি পুষ্টির খনি। ব্রকলি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বক চয় এবং ব্রাসেলস স্প্রাউটসের মতো ক্রুসিফেরাস সবজিগুলোতে প্রচুর পরিমাণে আঁশ (ফাইবার) এবং প্রয়োজনীয় ভিটামিন থাকে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য চিকিৎসকরা এই সবজিগুলো খাদ্যতালিকায় রাখার পরামর্শ দেন। তবে সমস্যাটি দেখা দেয় যখন এই সবজিগুলো রাতে বেশি পরিমাণে খাওয়া হয়। এসব সবজিতে এমন কিছু জটিল শর্করা থাকে যা হজম হতে সময় নেয় এবং অনেকের ক্ষেত্রে গ্যাস বা পেটফাঁপার সমস্যা তৈরি করে। বিশেষ করে শোয়ার পর যখন শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া ধীর হয়ে আসে, তখন এই অস্বস্তি আরও প্রকট মনে হতে পারে। তাই রাতে এই সবজিগুলো একেবারে বর্জন করার প্রয়োজন নেই, তবে যদি আপনি লক্ষ্য করেন যে এগুলো খেলে আপনার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে, তবে পরিমাণ কমিয়ে দিন অথবা দিনের শুরুর দিকে বা দুপুরে এগুলো খাওয়ার চেষ্টা করুন। এছাড়া অতিরিক্ত তেল ও মসলা দিয়ে রান্না করলে হজমের সমস্যা আরও বাড়তে পারে, তাই রাতের খাবারে এগুলো রাখলে হালকাভাবে রান্না করা শ্রেয়।

শিম, বরবটি ও অন্যান্য শিমজাতীয় খাবার প্রোটিন এবং আঁশের চমৎকার উৎস। পেট দীর্ঘক্ষণ ভরা রাখতে এবং সুষম খাদ্যতালিকা নিশ্চিত করতে বিনস, কড়াইশুঁটি ও ডালজাতীয় খাবারের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে কিছু মানুষের অন্ত্রে গ্যাস তৈরি হতে পারে। এর কারণ হলো, এসব খাবারে থাকা উচ্চমাত্রার আঁশ যখন অন্ত্রের অণুজীবগুলোর মাধ্যমে ভেঙে যায়, তখন উপজাত হিসেবে গ্যাস উৎপন্ন হয়। বিশেষ করে ঘুমানোর মাত্র আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা আগে এই ধরনের খাবার খেলে অস্বস্তির সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই শিমজাতীয় খাবারগুলো দিনের প্রথম ভাগে খাওয়া বেশি কার্যকর। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু সময় নয়, পরিমাণের ওপরও এটি নির্ভর করে। যদি দুপুরে বেশি পরিমাণে ডাল বা শিম খেয়েও আপনার গ্যাস হয়, তবে বুঝতে হবে আপনার শরীর এই নির্দিষ্ট খাবারে সংবেদনশীল। সেক্ষেত্রে শুধু রাতে বাদ দেওয়া সমাধান নয়, বরং সামগ্রিক পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

দুধ, দই ও পনিরের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। অনেকেরই ঘুমানোর আগে এক গ্লাস গরম দুধ খাওয়ার অভ্যাস আছে, কারণ দুধে থাকা ট্রিপটোফ্যান নামক অ্যামিনো অ্যাসিড ঘুমের জন্য সহায়ক হতে পারে। তবে দুধ খেলেই সবার ঘুম ভালো হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে যাঁদের ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স বা ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা রয়েছে, তাঁদের জন্য দুধ, দই বা পনিরের মতো দুগ্ধজাত খাবারগুলো দুঃস্বপ্নের মতো হতে পারে। এসব খাবার খেলে তাঁদের গ্যাস, পেটব্যথা, পেটফাঁপা এমনকি ডায়রিয়ার মতো সমস্যা হতে পারে, যা স্বাভাবিকভাবেই গভীর ঘুমে বাধা সৃষ্টি করে। আবার ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা না থাকলেও, ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত দুগ্ধজাত খাবার খেলে পাকস্থলীতে ভারি ভাব বা বদহজম হতে পারে। তাই দুধ পান করলে আপনার ঘুম ভালো হয় কি না, তা একান্তই আপনার ব্যক্তিগত শারীরিক অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠতে পারে—স্বাস্থ্যকর খাবার কেন সমস্যা তৈরি করে? আসলে একটি খাবার সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর হওয়া আর সেই খাবারটি আপনার নির্দিষ্ট শরীরে কী প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে, এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। ব্রকলি বা শিমে থাকা আঁশ শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী, কিন্তু কারও হজমতন্ত্র যদি উচ্চ আঁশে সংবেদনশীল হয়, তবে তা অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে দুধ পুষ্টিকর হলেও ল্যাকটোজ অসহিষ্ণু ব্যক্তির জন্য তা অস্বস্তিকর। তাই কেবল খাবারটি 'স্বাস্থ্যকর' কি না তা না দেখে, আপনার শরীর সেটি কীভাবে গ্রহণ করছে, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

খাবারের পাশাপাশি টাইমিং বা সময় নির্ধারণ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমানোর ঠিক আগ মুহূর্তে ভারী খাবার খেলে হজম প্রক্রিয়ায় চাপ পড়ে এবং অ্যাসিড রিফ্লাক্সের ঝুঁকি বেড়ে যায়। শোয়ার পর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে পাকস্থলীর খাবার ও অ্যাসিড উপরের দিকে উঠে আসার সম্ভাবনা থাকে, যা বুকজ্বালা বা অস্বস্তি তৈরি করে ঘুমের মান কমিয়ে দেয়। স্লিপ ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঘুমানোর অন্তত দুই থেকে চার ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করা স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে উপকারী। বিশেষ করে যাঁদের দীর্ঘদিনের অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা আছে, তাঁদের জন্য খাবার ও ঘুমের মাঝে পর্যাপ্ত সময়ের ব্যবধান রাখা অপরিহার্য।

এছাড়া আরও কিছু খাবার ও পানীয় রয়েছে যা ঘুমের কাছাকাছি সময়ে এড়িয়ে চলা উচিত। যেমন—অতিরিক্ত ঝাল খাবার, যা অনেকের বুকজ্বালা ও বদহজম বাড়িয়ে দেয়। ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার হজম হতে দীর্ঘ সময় নেয়, ফলে পেট ভার হয়ে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। চা, কফি কিংবা চকোলেটের মতো ক্যাফেইনযুক্ত খাবারগুলো মস্তিষ্ককে সজাগ রাখে, ফলে দ্রুত ঘুম আসতে দেরি হয়। এমনকি কিছু কোমল পানীয়তেও ক্যাফেইন থাকে যা ঘুমের চক্রকে বাধাগ্রস্ত করে। এছাড়া অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত শর্করাযুক্ত মিষ্টি খাবার রক্তে শর্করার মাত্রায় দ্রুত পরিবর্তন আনে, যা ঘুমের গভীরতাকে কমিয়ে দেয়।

তাহলে রাতে কী খাবেন? রাতের খাবার সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং পরিমিত এবং সহজে হজম হয় এমন খাবার বেছে নিন। ভাত বা রুটির সাথে মাছ, ডিম কিংবা হালকা প্রোটিন এবং আপনার শরীর সহ্য করতে পারে এমন সবজি রাখা যেতে পারে। রান্নায় তেল, ঝাল ও মসলার পরিমাণ কমিয়ে আনলে হজমের সমস্যা অনেকাংশেই কমে যায়। যাঁদের রাতে হালকা ক্ষুধা লাগে, তাঁরা ব্যক্তিগত সহনশীলতা অনুযায়ী হালকা কিছু খেতে পারেন, তবে ভারী খাবার এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

নিজের শরীরের সংকেত বুঝতে শিখুন। একই খাবার একজনের জন্য সমস্যা তৈরি করলেও অন্যজন তা সহজেই হজম করতে পারেন। তাই অন্যের অভিজ্ঞতা দেখে কোনো পুষ্টিকর খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আপনি যদি লক্ষ্য করেন যে রাতে ফুলকপি খেলে পেটফাঁপা হয়, তবে তা দুপুরে খাওয়ার চেষ্টা করুন। দুধের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য—পরিমাণ কমিয়ে বা সময় পরিবর্তন করে দেখুন আপনার শরীর কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়। তবে মনে রাখবেন, যদি কোনো খাবার খাওয়ার পর নিয়মিত তীব্র পেটব্যথা, ডায়রিয়া বা তীব্র বুকজ্বালা হয়, তবে তা কেবল খাবারের সমস্যা নাও হতে পারে; সেক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

পরিশেষে, ঘুম ভালো রাখতে খাবারের পাশাপাশি কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলুন। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও জাগার চেষ্টা করুন, রাতে ক্যাফেইনের পরিমাণ কমিয়ে দিন এবং শোয়ার আগে মোবাইল বা কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুন। ব্রকলি, বাঁধাকপি, শিম বা দুধ—কোনোটিই অস্বাস্থ্যকর নয়, বরং এগুলো সুষম খাদ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মূল বিষয় হলো সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণে গ্রহণ করা। রাতের খাবার পরিমিত রাখুন এবং ঘুমানোর অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে তা শেষ করার অভ্যাস করুন, যা আপনাকে দেবে এক প্রশান্তির ঘুম।

সূত্র: এই সময় অনলাইন