রাজধানীর হাজারীবাগের বস্তিসংলগ্ন খোলা মাঠে সারিবদ্ধভাবে সাজানো ছোট ছোট অসংখ্য স্টল। কোথাও চাল, ডাল, তেল, লবণের স্তূপ, কোথাও আবার তাজা মাছ আর মুরগির সমারোহ। আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ বাজার মনে হলেও, এই বাজারের বিশেষত্ব হলো এর লেনদেনের মাধ্যম। এখানে নিত্যপণ্য কিনতে কোনো নগদ টাকার প্রয়োজন হয় না; বরং সঙ্গে করে নিয়ে আসা প্লাস্টিক, পলিথিন, কাগজ, কাচসহ বিভিন্ন পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য জমা দিয়েই মিলছে প্রয়োজনীয় সামগ্রী। সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডের হাজারীবাগে এমনই এক ব্যতিক্রমী ও পরিবেশবান্ধব আয়োজনের সাক্ষী হয়ে থাকেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

পরিচ্ছন্ন নগর গড়ে তুলতে সাধারণ নাগরিকদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা এবং বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় কিছুটা সহায়তা করার লক্ষ্য নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এই ‘বর্জ্যের বিনিময়ে বাজার’ কর্মসূচি শুরু করেছে। অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পরপরই স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা যায়। তারা নিজেদের সংগ্রহ করা বর্জ্য জমা দিয়ে অস্থায়ী স্টলগুলো থেকে প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। অর্থের পরিবর্তে বর্জ্য দিয়েই সংসার চালানোর প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এই উদ্যোগটি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ পরিলক্ষিত হয়েছে।

এই বিশেষ বাজারে পণ্যের বিনিময়ে বর্জ্যের একটি নির্দিষ্ট হিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন—এক বেলা ভাত ও তরকারি পেতে হবে আধা কেজি বর্জ্য, একটি মুরগি পেতে ৬ কেজি এবং মাছ সংগ্রহ করতে হবে ৫ কেজি বর্জ্য জমা দিয়ে। এছাড়া নিত্যপণ্যের তালিকায় ১ কেজি চালের বিনিময়ে ১ কেজি বর্জ্য, ২ কেজি আটার জন্য ৪ কেজি, ১ কেজি ছোলার জন্য ২ কেজি, ১ কেজি মসুর ডালের জন্য ৩ কেজি এবং ১ কেজি চিনির জন্য ৩ কেজি বর্জ্য নির্ধারিত হয়েছে। বিনিময়ের তালিকায় আরও রয়েছে ১ কেজি লবণের জন্য ১ কেজি বর্জ্য, ৬টি ডিমের জন্য ১ কেজি, ১ লিটার সয়াবিন তেলের জন্য ৫ কেজি এবং ৫০০ গ্রাম সুজির জন্য ১ কেজি বর্জ্য। শুধু খাদ্যসামগ্রী নয়, এখানে জীবনযাত্রার অন্যান্য পণ্যের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে; যেমন একটি টি-শার্ট পেতে ২ কেজি, ১ প্যাকেট বিস্কুট পেতে ২ কেজি, ২টি নুডলস পেতে ১ কেজি, ১ প্যাকেট টোস্ট পেতে ২ কেজি, ১ প্যাকেট চানাচুর পেতে ২ কেজি এবং একটি স্কুলব্যাগ পেতে ৫ কেজি বর্জ্য জমা দিতে হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি এবং ‘বর্জ্যের বিনিময়ে বাজার’ সেই অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার একটি অত্যন্ত কার্যকর ও বাস্তবমুখী মডেল। প্রশাসক আরও উল্লেখ করেন যে, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন বর্জ্য যত্রতত্র ড্রেন ও নালা-নর্দমায় ফেলার কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়, যা শেষ পর্যন্ত জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। নাগরিকেরা যদি সচেতন হয়ে বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে জমা দেন, তবে জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিবেশ সুরক্ষা—এই দুটি লক্ষ্যই অর্জন করা সম্ভব হবে।

এই প্রশংসনীয় উদ্যোগকে পুরো নগরজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রশাসক জানান, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই গুলিস্তানে একটি স্থায়ী স্টল নির্মাণ করা হবে। এছাড়া আগামী ৩-৪ মাসের মধ্যে ডিএসসিসির প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে স্থায়ী স্টল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রের (এসটিএস) সুবিধাজনক স্থানে পথশিশুদের জন্য চেয়ার-টেবিল ও বইয়ের ব্যবস্থা করে ‘বই পড়ার বিনিময়ে খাবার’ নামক এক অনন্য কর্মসূচি চালু করার কথা জানান তিনি।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা প্রান্তিক মানুষকে শুধু সাহায্য প্রদান করে দায়িত্ব শেষ করছি না, বরং তাদের পরিচ্ছন্নতা অভিযানের অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলছি।’ তিনি জানান, গত দুই বছরে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও বিক্রি করে প্রায় ১ কোটি টাকা আয় হয়েছে, যা দিয়ে প্রায় ৪ লাখ মানুষকে আহার করানো সম্ভব হয়েছে। ডিএসসিসি ও বিদ্যানন্দের এই যৌথ উদ্যোগের আওতায় আগামী এক বছরে ১০০টি ভ্রাম্যমাণ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ কেজি বর্জ্য সংগ্রহের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার, সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের একঝাঁক নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক উপস্থিত ছিলেন।