প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি কাক। সাধারণ দৃষ্টিতে এদের কেবলক মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে এরা অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং এদের স্মৃতিশক্তি অস্বাভাবিক প্রখর। বিশেষ করে কোনো মানুষ যদি তাদের ওপর অন্যায় করে বা হুমকিস্বরূপ আচরণ করে, তবে সেই ক্ষোভ ও তিক্ত অভিজ্ঞতা কাকরা দীর্ঘ সময় ধরে মনে পুষে রাখতে পারে। সম্প্রতি পরিবেশ বিজ্ঞানীদের এক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় কাকের এই বিস্ময়কর প্রতিশোধপরায়ণতা এবং স্মৃতিশক্তির এক চমকপ্রদ তথ্য সামনে এসেছে।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত পরিবেশ বিজ্ঞানী অধ্যাপক জন মার্জলাফ ২০০৬ সালে এই বিশেষ গবেষণার সূত্রপাত করেন। পরীক্ষার শুরুতে তিনি একটি অত্যন্ত ভীতিকর দানবের মুখোশ পরে জালের সাহায্যে সাতটি কাক ধরেছিলেন এবং তাদের শনাক্তকরণের জন্য বিশেষ ব্যান্ড পরিয়ে পুনরায় মুক্ত করে দেন। স্বল্প সময়ের জন্য হলেও এই ঘটনাটি ধরা পড়া কাকগুলোর জন্য যেমন আতঙ্কজনক ছিল, তেমনি তা প্রত্যক্ষ করা আশেপাশের অন্যান্য কাকদের মনেও তীব্র ভীতির সৃষ্টি করেছিল।
পরবর্তী বছরগুলোতে অধ্যাপক মার্জলাফ এবং তাঁর গবেষক দল সেই নির্দিষ্ট মুখোশটি পরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিয়মিত ঘুরে বেড়াতে থাকেন এবং কাকদের প্রতিক্রিয়া গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। গবেষণায় দেখা যায়, সেই মুখোশ পরা মানুষকে দেখলেই কাকের দল দ্রুত একত্রিত হয়ে আক্রমণাত্মক ভঙ্গি গ্রহণ করে এবং উচ্চস্বরে ডেকে তীব্র প্রতিবাদ জানাতে থাকে। এক পর্যায়ে যখন গবেষক দল ৫৩টি কাকের মুখোমুখি হন, তখন দেখা যায় তাদের মধ্যে ৪৭টি কাকই মুখোশধারীকে ঘিরে ধরে ভর্ৎসনা শুরু করে। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই সংখ্যাটি মূল ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কাকদের সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
এই পর্যবেক্ষণ থেকে গবেষকরা এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছান। তারা দেখতে পান যে, কাকেরা কেবল নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই অন্যায়কারীকে মনে রাখে না, বরং বাবা-মা এবং দলের অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের চেহারা চিনে নিতে শেখে। অর্থাৎ, তারা সামাজিক শিক্ষার মাধ্যমে বিপদ সম্পর্কে সচেতন হয়। সাধারণত একটি বুনো কাকের গড় আয়ু এক দশকের কম হলেও, তারা নিজেদের প্রতি হওয়া অন্যায়ের স্মৃতি পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পৌঁছে দিতে পারে।
গবেষণার তথ্যানুসারে, ঘটনার সাত বছর পর কাকদের ক্ষোভ এবং আক্রমণের তীব্রতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তবে ২০১৩ সালের পর থেকে তাদের এই আক্রমণাত্মক মনোভাব ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। পরীক্ষা শুরুর ঠিক ১৭ বছর পর, গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো দেখা যায় যে, মুখোশ পরা থাকা সত্ত্বেও কাকদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ বা আক্রমণাত্মক আচরণ করা হয়নি।
গবেষণার নিরপেক্ষতা এবং সঠিকতা যাচাই করতে গবেষকরা সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির মুখের আদলে তৈরি আরেকটি শান্ত মুখোশ ব্যবহার করেছিলেন। দেখা গেছে, সেই মুখোশ পরা ব্যক্তিদের কাকেরা কোনোভাবেই আক্রমণ করেনি, বরং স্বাভাবিকভাবে তাদের হাত থেকে খাবার গ্রহণ করেছে। সিয়াটলে পরিচালিত অন্য একটি পরীক্ষাতেও ভিন্ন ধরনের মুখোশ পরা স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি কাকদের একই রকম আক্রমণাত্মক আচরণ লক্ষ্য করা গেছে।
কাকের এই অনন্য আচরণ প্রমাণ করে যে, এই বুদ্ধিমান প্রাণীটি সহজে কোনো হুমকিমূলক ঘটনা ক্ষমা করে না এবং স্মৃতিশক্তির সাহায্যে বছরের পর বছর ধরে অন্যায়কারীদের চিহ্নিত রাখতে সক্ষম। অধ্যাপক মার্জলাফ অতি শীঘ্রই তাঁর এই দীর্ঘ ১৭ বছরের গবেষণার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করতে যাচ্ছেন, যা প্রাণিবিজ্ঞানের জগতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।





















