দেশের বড় অঙ্কের ঋণে জর্জরিত বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্পগোষ্ঠীর আর্থিক সংকট নিরসনে নতুন করে ব্যাপক নীতি সহায়তা ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে একক প্রতিষ্ঠান বা কোনো নির্দিষ্ট গ্রুপের ঋণের পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি হলে তারা সর্বোচ্চ দুই বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছর পর্যন্ত ঋণ বিশেষ পুনঃতফসিলের সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে বিশেষ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নির্ধারিত মেয়াদের বাইরে আরও সর্বোচ্চ চার বছর অতিরিক্ত সময় পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ (বিআরপিডি) এই সংক্রান্ত একটি সার্কুলার লেটার (নং-৩০) জারি করেছে। দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এই নির্দেশনাটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে যে, ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখা এবং তাদের আর্থিক কাঠামো পুনর্গঠনের লক্ষ্যে আগে দেওয়া নীতি সহায়তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতেই এই নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, বিআরপিডি সার্কুলার নং-০৭/২০২৫-এর আওতায় নীতি সহায়তা পাওয়ার জন্য আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নতুন আবেদন গ্রহণ করা যাবে। তবে এই সুবিধা কেবল নতুন আবেদনকারীদের জন্য নয়; যেসব ঋণগ্রহীতা আগে ব্যবসা ও আর্থিক কাঠামো পুনর্গঠনের লক্ষ্যে গঠিত নীতি সহায়তা-সংক্রান্ত বাছাই কমিটির মাধ্যমে সুবিধা গ্রহণ করেছেন, তারাও পুনরায় আবেদন করার সুযোগ পাবেন।
নতুন এই সার্কুলারে সবচেয়ে বড় সুবিধা দেওয়া হয়েছে বৃহৎ ঋণগ্রহীতাদের। কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপের নীতি সহায়তার আওতায় বিশেষ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের জন্য আবেদন করা ঋণের স্থিতি ১ হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি হলে, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ মোট ১৫ বছর পর্যন্ত ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ থাকবে। এর অর্থ হলো, বড় ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলো কিস্তি পরিশোধ শুরু করার আগে সর্বোচ্চ দুই বছর সময় পাওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘ ১৫ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাবে, যা তাদের নগদ প্রবাহের চাপ কমাতে সহায়ক হবে।
বিশেষ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে। বিআরপিডি সার্কুলার নং-১৬/২০২২-এ নির্ধারিত মেয়াদের বাইরে আরও সর্বোচ্চ চার বছর অতিরিক্ত সময় দিয়ে ঋণ পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে। তবে এই বিশেষ সুবিধা সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। একক প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপের আবেদন করা ঋণের পরিমাণ যদি ১ হাজার কোটি টাকার কম হয়, তবে বিশেষ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বিআরপিডি সার্কুলার নং-০৭/২০২৫-এ নির্ধারিত পূর্বের মেয়াদই বহাল থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানিয়েছে, যেসব ঋণগ্রহীতা ইতোমধ্যে বিআরপিডি সার্কুলার নং-০৭/২০২৫ অথবা নীতি সহায়তা-সংক্রান্ত বাছাই কমিটির আওতায় সুবিধা পেয়েছেন, তারাও নতুন নির্দেশনায় বর্ণিত বাড়তি সুবিধাগুলো গ্রহণ করতে পারবেন। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, আগে নেওয়া গ্রেস পিরিয়ডের সময় নতুন করে গণনা করা হবে না। ইতোমধ্যে যে সময় পার হয়ে গেছে, সেটিই নতুন নির্ধারিত গ্রেস পিরিয়ডের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী বিধিবদ্ধ সীমার মধ্যে অতিরিক্ত সময় প্রদানের সুযোগ রাখা হয়েছে।
নতুন আবেদনের ক্ষেত্রে ঋণের শ্রেণিমান অনুযায়ী আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অশ্রেণিকৃত ঋণগুলো বিশেষ পুনর্গঠন সুবিধার আওতায় আসবে। অন্যদিকে, বিরূপমানে শ্রেণিকৃত ঋণগুলো বিশেষ পুনঃতফসিলের সুযোগ পাবে। তবে সব আবেদনই নির্ধারিত শর্ত পূরণ এবং প্রয়োজনীয় ডাউনপেমেন্ট গ্রহণের পর নিষ্পত্তি করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশ দিয়েছে, এই সার্কুলারের আওতায় জমা হওয়া সব আবেদন আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ সালের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৯(১)(চ) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ ব্যাংক এই নির্দেশনা জারি করেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বড় অঙ্কের ঋণে জর্জরিত এবং তীব্র আর্থিক সংকটে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই সিদ্ধান্তটি একটি উল্লেখযোগ্য নীতি সহায়তা হিসেবে কাজ করবে। দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পুনর্বিন্যাসের সুযোগ পেলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নগদ অর্থের সংকট কমবে এবং তারা পুনরায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাবে।
তবে এই সিদ্ধান্তটি ব্যাংক খাতের সামগ্রিক ঋণ শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনঃতফসিল, দুই বছর পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড এবং বিশেষ পুনর্গঠনে অতিরিক্ত সময় দেওয়ার ফলে প্রকৃত খেলাপি ঋণ আদায় কতটা বাড়বে, সেটি নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। বিশেষ করে ব্যাংক খাতে যখন খেলাপি ঋণের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে এবং দীর্ঘদিন ধরে বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের নানা সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, তখন নতুন এই নীতি সহায়তা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা পুনরুদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা রাখবে নাকি বড় ঋণখেলাপিদের জন্য আরও একবার ছাড়ের সুযোগ তৈরি করবে—সেটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে।





















