পিরোজপুর শহরে এক অভূতপূর্ব জনসমুদ্রের উপস্থিতিতে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ঘোষিত ‘জুলাই পদযাত্রা’ ও পথসভা। দেশব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত এই বিশেষ কর্মসূচিতে স্থানীয় জনগণের ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে, যা পিরোজপুরের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
গত ২০ জুলাই, সোমবার বিকেল পাঁচটায় শহরের ঐতিহাসিক সিও অফিস মোড় থেকে এই বর্ণাঢ্য পদযাত্রাটির সূচনা হয়। সেখান থেকে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পদযাত্রাটি পিরোজপুর শহীদ মিনার সংলগ্ন জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্বে গিয়ে শেষ হয় এবং সেখানে একটি বিশাল পথসভার আয়োজন করা হয়। পুরো কর্মসূচির সার্বিক সমন্বয়কারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পিরোজপুর জেলা এনসিপির সদস্য সচিব এবং আসন্ন পিরোজপুর পৌরসভা নির্বাচনে এনসিপি মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থী মইনুল আহসান মুন্না। তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে এবং দিকনির্দেশনায় শত-শত ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ এই পদযাত্রায় অংশ নেন, যা রাজপথে এক বিশাল গণজমায়েতের রূপ নেয়।
এই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিতে এবং স্থানীয় আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে পিরোজপুরে উপস্থিত হয়েছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। পথসভায় প্রধান বক্তা হিসেবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক এবং এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি উপস্থিত ছাত্র-জনতার উদ্দেশ্যে এক অত্যন্ত ওজস্বী এবং দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন। তাঁর বক্তব্যে তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নাগরিক দায়িত্বের কথা গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন।
হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি তাঁর বক্তব্যে দেশের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "একজন আলেম বুঝেছিলেন, তাঁর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত যদি এই সরকার টিকে থাকে। ব্যবসায়ীরা যখন উপলব্ধি করেছিলেন যে, তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত যদি এই সরকার টিকে থাকে, তখন তারা সোচ্চার হয়েছেন। দেশের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ যখন রাস্তায় নেমে এসে নিজেদের দায়িত্বটা বুঝে নিয়েছিলেন, কেবল তখনই প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব হয়েছিল।"
তিনি স্থানীয় পিরোজপুরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে আরও বলেন, "ঠিক সেইভাবে, প্রিয় পিরোজপুরবাসী, আমরা এখানে মাইকের সামনে যতই বক্তব্য দিই না কেন, দিনশেষে প্রকৃত পরিবর্তন হবে না— যদি না আপনারা যারা সামনে আছেন এবং যারা দূর থেকে শুনছেন, আপনারা আপনাদের নিজেদের দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যকে কাঁধে তুলে নেন। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনারা সক্রিয় না হবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এই দেশের সামগ্রিক পরিবর্তন সম্ভব নয়।"
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে স্বীকার করেন, "ঠিক একইভাবে দোষ আমাদের ওপরও যায়। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়ারা—একটি চাকরির আশায় অনেক শিক্ষার্থী মুখ বুজে এবং চোখ বুজে এই ফ্যাসিবাদকে প্যাসিভলি মেনে নিয়েছিলাম। তবে আমরা দেখেছি, পরিবর্তন তখনই এসেছিল যখন প্রত্যেকেই প্রত্যেকের জায়গা থেকে তাঁর দায়িত্ব অনুযায়ী রাস্তায় নেমে এসেছিল।"
সংসদে তাঁদের জোরালো ভূমিকার কথা উল্লেখ করে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, "প্রিয় পিরোজপুরবাসী, আমরা আপনাদের কথা দিচ্ছি— অনেকেই বলেন এই ছয় জন ইকুয়াল টু বাকি ২১৭ জন। কিন্তু বাস্তব এই যে, আমাদের ছয় জনের পাঁচ মিনিটের কথার উত্তর দিতে এই সরকারের অনেক বাঘা বাঘা মন্ত্রীর ৪৫ মিনিট সময় চলে যায়। আমরা শুরু করেছি ছয় সদস্য দিয়ে, কিন্তু ইনশাআল্লাহ খুব শীঘ্রই এই সংখ্যা ১৬০-এ পরিণত হবে। এই লক্ষ্য তখনই অর্জিত হবে, যখন আমার মায়েদের সমর্থন আমাদের সাথে থাকবে, যখন আমার বাবারা জুলাইয়ের মতো আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবেন এবং যখন ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের পাশে থাকবেন।"
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি রাজনৈতিক সততার কথা উল্লেখ করে বলেন, "মনে রাখতে হবে, যে রাজনৈতিক দল আপনার ঘরে তোলার রাজনৈতিক দল, যে রাজনৈতিক দল আপনার খেটে পরিশ্রম করে গড়ে তোলা, ওই রাজনৈতিক দলই কেবল সংসদে আপনার হয়ে কথা বলবে। আর যে রাজনৈতিক দল ব্যবসায়ীদের দ্বারা পরিচালিত কিংবা বিদেশ থেকে নিয়ন্ত্রিত, সেই রাজনৈতিক দল কখনোই জনগণের ভাষায়, জনগণের হয়ে এবং জনগণের পক্ষে কথা বলবে না।"
এই সফল পদযাত্রা ও পথসভায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর পাশাপাশি ছাত্রশক্তি ও নারী শক্তির কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি, কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার, কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, কেন্দ্রীয় সদস্য আরিফুল ইসলাম আদিব এবং ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি জাহিদ আহসান।
এছাড়া স্থানীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পিরোজপুর-৩ আসনের এনসিপি মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ডাঃ শামীম হামিদী, এনসিপি পিরোজপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির এবং সদস্য সচিব ও পৌরসভা নির্বাচনের মেয়র পদপ্রার্থী মইনুল আহসান মুন্না প্রমুখ।
আজকের মূল পদযাত্রা ও পথসভায় পিরোজপুর পৌরসভা এবং এর আশেপাশের বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আসা তৃণমূল প্রতিনিধি ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। উপস্থিত বক্তারা স্থানীয় পৌর এলাকার বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা, দীর্ঘদিনের দুর্নীতি দূরীকরণ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানান। সেই সাথে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে এনসিপি মনোনীত প্রার্থীকে বিজয়ী করে পিরোজপুর জেলাকে এনসিপির একটি শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন উপস্থিত সকলে।











