ধূমপান বা নিকোটিন গ্রহণের ফলে ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হয়—এই কথাটি এখন আর নতুন নয়, বরং সর্বজনবিদিত। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন নিকোটিনের আরও এক অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছে, যা মানুষের ব্যক্তিগত সুখ ও দাম্পত্য জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত নিকোটিন গ্রহণ বা দীর্ঘমেয়াদী ধূমপানের অভ্যাসের কারণে মানুষের স্বাভাবিক যৌন আকাঙ্ক্ষা বা ‘লিবিডো’ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে। এই বিষয়ে হেলথলাইন ডটকম’য়ে প্রকাশিত এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ই-সিগারেট, ভেপ, সাধারণ সিগারেট কিংবা নিকোটিন প্যাচ—যেকোনো মাধ্যমেই শরীরে অতিরিক্ত নিকোটিন প্রবেশ করলে তা সরাসরি যৌন হরমোন এবং সামগ্রিক প্রজনন স্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি করে।

পুরুষদের ওপর নিকোটিনের প্রভাব এবং ‘সেক্সুয়াল ডিসফাংশন’ নিয়ে ২০২০ সালে এক বিশেষ গবেষণা চালানো হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ‘মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল’-এর গবেষকরা মূলত তরুণদের ওপর এই সমীক্ষাটি পরিচালনা করেন। চিকিৎসা সাময়িকী ‘অ্যান্ড্রোলজিয়া’-তে প্রকাশিত এই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, যারা অতিরিক্ত নিকোটিন বা সিগারেটের ওপর নির্ভরশীল, তাদের মধ্যে ‘সেক্সুয়াল ডিসফাংশন’ বা যৌন জটিলতার ঝুঁকি অনেক বেশি। গবেষকরা ব্যাখ্যা করেছেন যে, নিকোটিন ব্যবহারের ফলে শরীরের রক্তনালীগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ে, যার ফলে যৌনাঙ্গে রক্ত সঞ্চালন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এই রক্তসঞ্চালনের অভাবের কারণে যৌন উদ্দীপনা হ্রাস পায় এবং দীর্ঘক্ষণ ইরেকশন বা লিঙ্গোত্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি অর্গাজম বা চূড়ান্ত তৃপ্তি পাওয়ার ক্ষমতাও আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়, যা পুরুষের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

একই ধরনের প্রভাব দেখা গেছে প্রবীণ পুরুষদের ক্ষেত্রেও। ২০২১ সালে জাপানের ‘কানাজাওয়া ইউনিভার্সিটি গ্রাজুয়েট স্কুল অফ মেডিকেল সায়েন্স’-এর গবেষকরা প্রবীণ পুরুষদের ওপর একটি বিস্তারিত গবেষণা চালান। ‘জার্নাল অফ সেক্সুয়াল মেডিসিন’-এ প্রকাশিত সেই গবেষণার প্রধান লেখক ডা. লিউ এবং তার সহযোগী গবেষকেরা দেখিয়েছেন যে, মধ্যবয়সী এবং প্রবীণ পুরুষদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ধূমপানের অভ্যাস গুরুতরভাবে যৌন আকাঙ্ক্ষা বা শারীরিক মিলনের তীব্র ইচ্ছা কমিয়ে দেয়। এটি প্রমাণ করে যে, নিকোটিনের প্রভাব কেবল তরুণ প্রজন্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বয়সের সাথে সাথে এর ক্ষতিকর প্রভাব আরও প্রকট হতে পারে।

নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য ও হরমোনের ওপর নিকোটিনের প্রভাব নিয়ে গবেষণার সংখ্যা পুরুষদের তুলনায় কিছুটা কম হলেও, প্রাপ্ত ফলাফল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০১৩ সালে ‘জার্নাল অফ অ্যাডিকশন মেডিসিন’-এ নারীদের মাদক ও নিকোটিন আসক্তি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশিত হয়। ব্রাজিলের ‘ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অফ সাও পাওলো’র করা সেই গবেষণায় দেখা গেছে, যে নারীরা তীব্র নিকোটিন নির্ভরতায় ভুগছেন, তাদের যৌন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার এবং বিভিন্ন ‘সেক্সুয়াল ডিসফাংশনে’ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ নারীদের চেয়ে প্রায় ৩ গুণ বেশি। এছাড়া ২০১৫ সালে ‘ইউরোপিয়ান জার্নাল অফ অবস্টেট্রিক্স অ্যান্ড গাইনিকোলজি’-তে প্রকাশিত কোরিয়ার ‘সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ মেডিসিন’-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, মেনোপজ বা পিরিয়ড স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার পূর্ববর্তী বয়সের যে নারীরা নিয়মিত ধূমপান করেন, তাদের মধ্যে শারীরিক মিলনের আকাঙ্ক্ষা, উদ্দীপনা এবং তৃপ্তির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকে।

বিজ্ঞানীদের মতে, নিকোটিন মূলত মানুষের ‘সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম’ বা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র এবং হরমোনের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতিকে ওলটপালট করে দেয়। যৌন উদ্দীপনা এবং আকাঙ্ক্ষার জন্য শরীরে যে নির্দিষ্ট হরমোনের নিঃসরণ এবং মানসিক প্রশান্তির প্রয়োজন হয়, নিকোটিন মস্তিষ্কের সেই রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে। এর ফলে শরীর ও মনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ঘটে এবং স্বাভাবিক যৌন ইচ্ছা স্তিমিত হয়ে আসে।

তবে এই অন্ধকার চিত্রের মাঝে আশার কথা হলো, নিকোটিনের কারণে হওয়া এই ক্ষতিগুলো স্থায়ী নয়, বরং পরিবর্তনযোগ্য। ২০১৭ সালে ‘ইউরোলজি জার্নাল’-এ প্রকাশিত ‘লস অ্যাঞ্জেলেস মেডিকেল সেন্টার’-এর এক গবেষণায় প্রোস্টেট অস্ত্রোপচার পরবর্তী পুরুষদের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। সেখানে গবেষকেরা দেখিয়েছেন যে, যারা নিয়মিত ধূমপান করার অভ্যাস পুরোপুরি ত্যাগ করেছেন, তাদের প্রজনন ক্ষমতা ও যৌন স্বাস্থ্য পরবর্তী ১ থেকে ২ বছরের মধ্যে আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে এবং স্বাভাবিক যৌন আকাঙ্ক্ষা পুনরায় ফিরে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, দাম্পত্য জীবনে সুখী থাকতে এবং প্রজনন স্বাস্থ্য দীর্ঘমেয়াদে ভালো রাখতে যে কোনো ধরনের তামাক ও নিকোটিনযুক্ত পণ্য সম্পূর্ণ বর্জন করা উচিত। জীবনযাত্রার এই ইতিবাচক পরিবর্তনের পরেও যদি যৌন আকাঙ্ক্ষার ঘাটতি থেকে যায়, তবে লোকলজ্জার ভয় না পেয়ে দ্রুত একজন অভিজ্ঞ ‘ইউরোলজিস্ট’ বা যৌন-স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত উপকারী ও প্রয়োজনীয় হবে।