রোহিঙ্গা সংকটের এক দশক পূর্ণ হওয়ার এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে। এই মানবিক সংকট যেন আর দীর্ঘায়িত না হয় এবং ১০ বছর থেকে ২০ বছরে পরিণত না হয়, সেই লক্ষ্যেই এখন সর্বোচ্চ কূটনৈতিক ও মানবিক চেষ্টা চালানো প্রয়োজন। রোববার (২৩ আগস্ট) রাজধানীর লেক শোর হোটেলে আয়োজিত এক বিশেষ সেমিনারে এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। ‘রোহিঙ্গা সংকটের এক দশক: মানবিক প্রতিক্রিয়া থেকে টেকসই সমাধান’ শীর্ষক এই সেমিনারের প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন। অক্সফাম এবং ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিকাব) যৌথভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় বলেন, ১০ বছর একটি সরকারের জন্য হয়তো কেবল একটি নীতিগত চক্র বা নির্দিষ্ট সময়সীমা হতে পারে, কিন্তু শরণার্থী শিবিরে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর কাছে এই ১০ বছর মানে তার পুরো শৈশবের বিলীন হয়ে যাওয়া। একজন তরুণের কাছে এটি তার শিক্ষা লাভের সুযোগ হারিয়ে ফেলার গল্প এবং একটি পুরো পরিবারের কাছে এটি ভিটেমাটি ছেড়ে ঘরছাড়া জীবনের এক দীর্ঘ যন্ত্রণাদায়ক দশক। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, আমরা কোনোভাবেই এই ১০ বছরের সংকটকে ২০ বছরে পরিণত হতে দিতে পারি না।
তিনি মনে করিয়ে দেন, ২০১৭ সালে মিয়ানমারে ব্যাপক অস্থিতিশীলতার পর যখন লাখ লাখ রোহিঙ্গা প্রাণভয়ে পালিয়ে আসছিল, তখন বাংলাদেশ তার সীমান্ত ও হৃদয় উন্মুক্ত করে ১২ লাখের বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, প্রাথমিক শিক্ষা এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নিরলসভাবে কাজ করে গেছে। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ এই বিশাল দায়িত্ব গ্রহণ করেছে কেবল মানবিক মূল্যবোধ এবং নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে। তবে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ এমন কোনো সংকটের চূড়ান্ত সমাধান করতে পারে না, যে সংকটের সৃষ্টি বাংলাদেশ করেনি।
শামা ওবায়েদ বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে আসা মানবিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রশংসনীয়, তবে এটি রোহিঙ্গা সংকটের চূড়ান্ত বা স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। এই সংকটের মূল উৎস মিয়ানমার এবং তাই টেকসই সমাধানও সেখানেই খুঁজে বের করতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য হলো মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা। তিনি আরও জানান, রোহিঙ্গারা নিজেরাও বারবার তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তাই তাদের এই মানবিক আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করতে হবে এবং প্রত্যাবাসনের যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।
মানবিক সহায়তার ক্রমবর্ধমান ঘাটতির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০২৬ সালের যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা (জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান) সংকুচিত হলেও রোহিঙ্গাদের মৌলিক প্রয়োজন কিন্তু কমেনি। খাদ্য, পুষ্টি, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, শিক্ষা ও সুরক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এগুলো জীবন রক্ষার জন্য অপরিহার্য উপাদান। কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর সৃষ্ট চাপের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে গিয়ে স্থানীয় জনগণ তাদের জমি, সম্পদ, পরিবেশ এবং জনসেবার ওপর প্রচণ্ড চাপ সহ্য করছে। তাই মানবিক কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা, জাতিসংঘের মধ্যস্থতা এবং আঞ্চলিক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে কাজ চালিয়ে যাবে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আরও জোরালো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, টেকসই কূটনীতি, নিশ্চিত অর্থায়ন এবং যথাযথ জবাবদিহিতা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার আশাবাদী যে, অতীতের মতো এবারও রোহিঙ্গাদের তাদের মাতৃভূমিতে নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এছাড়া গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এই সংকটকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সেমিনারে আরও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, ঢাকার চীনা দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন লিউ ইউয়িন এবং আইওএম বাংলাদেশের চিফ মিশন ড. ল্যরা টম্ব বন্ডে প্রমুখ।

















