স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ ও প্রক্রিয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবং সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীর পরস্পরবিরোধী মন্তব্য এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতাহীন ও নতজানু ভূমিকার তীব্র প্রতিবাদ, ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দলের আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব এক যৌথ বিবৃতিতে এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

বিবৃতিতে জানানো হয়, নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ কর্তৃক স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সাতটি ধাপের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার পরপরই স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলম সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিভ্রান্তিকর একটি বক্তব্য প্রদান করেন। প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, এ ব্যাপারে সরকার কিছুই জানে না এবং সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আলোচনাও হয়নি। নির্বাচন কমিশনারের ঘোষণার পর সরকারের এই বক্তব্য এবং পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদের গণমাধ্যমে দেওয়া মন্তব্য— যেখানে তিনি বলেন, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য ‘শিরোধার্য’ এবং এ বিষয়ে কোনো পাল্টা মন্তব্য করার ধৃষ্টতা দেখাবেন না— এটি নির্বাচন কমিশনের চরম মেরুদণ্ডহীনতা এবং পরাধীনতাকেই উন্মোচিত করেছে।

এনসিপি নেতৃবৃন্দ বলেন, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব সিদ্ধান্ত ও অবস্থান থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং অপরিহার্য। কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘শিরোধার্য’ মেনে ইসি সচিবের এই আত্মসমর্পণ প্রমাণ করে যে, কমিশন আজ সংবিধান প্রদত্ত তার স্বাধীন ভূমিকা প্রয়োগ করতে পারছে না এবং এটি পুরোপুরি সরকারের একটি আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সরকারের প্রভাবে ও ক্রমাগত চাপের মুখে নির্বাচন কমিশন একেক সময় একেক রকম কথা বলে চরম খামখেয়ালিপনা প্রদর্শন করছে, যা একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ন্যূনতম গ্যারান্টিকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে।

বিবৃতিতে এনসিপি নেতৃবৃন্দ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচিত হয়ে এসে বর্তমান সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার বদলে উল্টো সেগুলোকে দলীয়করণ করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে পকেটে পুরে ও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে নির্বাচন পরিচালনা করার এই অপচেষ্টা মূলত ফ্যাসিবাদী কায়দায় ক্ষমতার লালসা ও অগণতান্ত্রিক চর্চারই একটি স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। এর মধ্যে সরকার তাদের দলের নির্বাচনী কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত একজন ব্যক্তিকে কমিশনের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদানের মাধ্যমে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে দলীয় আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেছে, নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে সরকারি প্রভাব ও হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। সরকারি নির্বাহী বিভাগের সামনে নতি স্বীকার করে ইসির মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার অপরাধে কমিশনের এমন অপেশাদার অবস্থানের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্বাহী বিভাগের যে অবৈধ প্রভাব ও অগণতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ চলছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

নেতৃবৃন্দ কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুনভাবে গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হওয়া রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কোনো মেরুদণ্ডহীন ও সরকারি ক্যাডার তন্ত্রের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন জনগণ মেনে নেবে না। সরকার যদি নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে না দেয় এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালিত করতে অগণতান্ত্রিক পথে হাঁটে, তবে এনসিপি দেশের আপামর জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে কঠোর প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলবে।