দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিতে শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে প্রবেশ করেছেন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সন্ধ্যা ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে তাঁর গাড়িবহর যখন বঙ্গভবনের প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে, তখন সেখানে এক রাজকীয় ও আনুষ্ঠানিক পরিবেশ বিরাজ করছিল। রাষ্ট্রপতির এই গুরুত্বপূর্ণ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শুক্রবার বিকেল থেকেই বঙ্গভবন প্রাঙ্গণসহ আশপাশের এলাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বিশেষ ট্রাফিক ডাইভারশন রাখা হয়েছে এবং যানবাহন চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। বিভিন্ন পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে, যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়।
শপথ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রিত অতিথিদের আগমন শুরু হয় দুপুর থেকেই। যথাযথ প্রটোকল মেনে এবং আমন্ত্রণপত্রের কার্ড প্রদর্শনের পর অতিথিদের বঙ্গভবনে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে উপস্থিত হয়েছেন মন্ত্রিসভার সদস্য, জাতীয় সংসদের সদস্য, প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা, উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, বিচারপতি এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি হিসেবে বঙ্গভবনের সামনের দীর্ঘদিনের ব্যারিকেডগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আশপাশের সড়ক এবং ফুটপাতগুলোকে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। বিশেষ করে গুলিস্তান থেকে বঙ্গভবনমুখী সড়কের ফুটপাত থেকে অবৈধ ব্যবসায়ীদের সরিয়ে দেওয়ায় এলাকাটি আগের চেয়ে অনেক বেশি খোলামেলা ও পরিচ্ছন্ন মনে হচ্ছিল, যদিও সাধারণ মানুষের চলাচল স্বাভাবিক ছিল।
বঙ্গভবনের দরবার হলে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল তাঁকে শপথ পাঠ করাবেন। পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে, এরপর রাষ্ট্রপতি তাঁর শপথ গ্রহণ করবেন। শপথ পাঠ শেষে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ বইয়ে স্বাক্ষর করবেন এবং সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির নির্ধারিত চেয়ারে আসীন হবেন।
বঙ্গভবন ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য ১ হাজার ২০০-এর বেশি আমন্ত্রণপত্র বিতরণ করা হয়েছে। অতিথিদের ভিড় সামলাতে দরবার হলের আসন সংখ্যা সাধারণ সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। সাধারণত এখানে প্রায় ৪০০ জনের বসার ব্যবস্থা থাকলেও এবার তা বাড়িয়ে ৮০০-এর বেশি করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি, বিদেশি রাষ্ট্রদূত, বিরোধী দলের নেতা ও সংসদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, অভিজ্ঞ সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন।
রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণের পরপরই মন্ত্রিসভার নতুন চার সদস্যের শপথ গ্রহণের কথা রয়েছে। জানা গেছে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ এবং বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী মন্ত্রী হিসেবে এবং গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারেন। তাঁদের শপথ পাঠ করাবেন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শপথ অনুষ্ঠানের আগে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বঙ্গভবনে উপস্থিত হবেন। এরপর নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বঙ্গভবনে প্রবেশ করে দরবার হলে যাবেন।
এদিকে, এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত ঘিরে বঙ্গভবনের বাইরে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। নিরাপত্তার কারণে মূল প্রবেশপথের সামনে যানবাহনের চলাচল সীমিত থাকলেও দলটির অনেক নেতাকর্মীকে সেখানে অবস্থান করতে দেখা গেছে। উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ২৫৫টি ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ ৮৮টি ভোট পান। নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মির্জা ফখরুলকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করে। এর আগে গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার ফলে রাষ্ট্রপতি পদটি শূন্য হয়। সংবিধান অনুযায়ী, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল স্পিকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের এই সাময়িক দায়িত্বের অবসান ঘটবে।















