রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে তীব্র জ্বালানি সংকটে দিশেহারা চালক ও যাত্রীরা। জ্বালানির অভাবে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করছেন চালকরা, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের আয়ের ওপর। রাজধানীর খিলগাঁও নয়াপাড়ার বাসিন্দা ও পেশায় সিএনজিচালক মোতালেব হোসেনের জীবন এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে। গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় তিনি হাজিপাড়া সিএনজি স্টেশনে গ্যাসের জন্য সিরিয়াল দিয়েছিলেন। বিটিভির সামনে সিরিয়াল দিলেও রাত ১০টা পার হওয়ার পর তিনি মাত্র রামপুরা বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হন।
ঘটনাস্থলে মোতালেবের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে ডেমরায় সিরিয়াল দিয়ে বিকেল ৫টার দিকে তিনি মাত্র ৮০ টাকার গ্যাস পেয়েছিলেন। সেই সামান্য গ্যাসে প্রথমে ৩৫০ টাকায় যাত্রী নিয়ে বসুন্ধারা সিটিতে যান তিনি। সেখান থেকে গুলশান-১-এ আরেকজন যাত্রীকে নিয়ে যাওয়ার পথে হঠাৎ সিএনজিতে গ্যাসের লালবাতি জ্বলে ওঠে। দ্রুত হাজিপাড়ার দিকে ফেরার চেষ্টা করলেও বাড্ডা ইউলুপ থেকে রামপুরার দিকে নামতেই শেষ হয়ে যায় জ্বালানি। মাঝরাস্তায় গাড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় তাকে। পরবর্তীতে একটি অটো রিকশার সাহায্যে টেনে গাড়িটি নিয়ে পুনরায় গ্যাসের সিরিয়ালে দাঁড়াতে হয়। হতাশ হয়ে মোতালেব বলেন, “এই হলো আমাদের জীবনের করুণ চিত্র। এখন আমি বুঝে উঠতে পারছি না যে গ্যাস নেব নাকি গাড়ি চালাব? কিছুই ভাবতে পারছি না।” তার মতে, শুধু তিনি নন, রাজধানীর প্রায় সব সিএনজি চালকই এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
তদন্ত করে দেখা গেছে, চলমান এই গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন সিএনজি চালকরা। ব্যক্তিগত গাড়িগুলো বিকল্প হিসেবে তেল ব্যবহার করতে পারলেও, সিএনজিগুলো সম্পূর্ণভাবে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। একদিকে জ্বালানি সংকটে তারা পর্যাপ্ত ভাড়া মারতে পারছেন না, অন্যদিকে মাথার ওপর চেপে বসেছে গাড়ির দৈনিক জমার বোঝা। এই দ্বিমুখী চাপে চালকদের জীবন এখন নাভিশ্বাস হয়ে উঠেছে। সিএনজি চালক কালামের কণ্ঠে ফুটে ওঠে সেই দীর্ঘশ্বাস। তিনি বলেন, “গ্যাস সংকট কবে শেষ হবে, আমরা কবে স্বাভাবিকভাবে গাড়ি চালাতে পারব, কেউ আমাদের কোনো নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। আমাদের দুর্ভোগ কেবল বেড়েই চলেছে। আমরা গাড়ির দৈনিক জমাই এখন উঠাতে পারছি না, ফলে ছেলেমেয়েদের মুখে কী খাবার দেব তা নিয়ে চিন্তিত আছি। আমরা চুক্তিতে গাড়ি চালাই; গাড়ি চলুক বা না চলুক, মালিককে নির্দিষ্ট জমা দিতেই হয়। মালিক তো আর গ্যাস সংকটের কথা বিবেচনা করবেন না। আমাদের এই দুর্দশার শেষ নেই, সরকারের উচিত দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করা।”
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, রাতের বেলা কিছু স্টেশনে সামান্য গ্যাস মিললেও দিনের বেলা পরিস্থিতি থাকে অত্যন্ত শোচনীয়। অধিকাংশ সিএনজি স্টেশনই কোনো গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না এবং অনেকটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশন পরিদর্শন করে এবং চালকদের সঙ্গে কথা বলে এই ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। ইনট্রাকো ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষমাণ চালক আলমগীর হোসেন জানান, “গতকাল আমি মাত্র ৬০ টাকার গ্যাস পেয়েছি। সেই সামান্য গ্যাসে এক হাজার টাকা ভাড়া মারলেও আমার জমা দিতে হয় ১২০০ টাকা। এখন মালিক কী খাবে আর আমি কী খাব?”
সকাল থেকে উত্তরার আব্দুল্লাহপুর, বিমানবন্দর এবং খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, গ্যাস না থাকায় অধিকাংশ পাম্প বন্ধ। যেসব পাম্প চালু আছে, সেখানেও গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম থাকায় স্বাভাবিক সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সিএনজি, ট্রাক এবং অন্যান্য গ্যাসচালিত যানবাহনের জ্বালানি সরবরাহ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। আব্দুল্লাহপুরের পূর্ব পাশে অবস্থিত খন্দকার ফিলিং স্টেশন এবং বিমানবন্দর-খিলক্ষেত এলাকার বিভিন্ন পাম্পে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থেকেও চালকরা গ্যাস পাচ্ছেন না। খন্দকার ফিলিং স্টেশনের অপারেটর মনির হোসেন বলেন, “আমাদের কাছেই যদি গ্যাস না থাকে, তবে আমরা গ্রাহকদের কীভাবে দেব? গত দুই সপ্তাহ ধরে আমরা পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছি না, ফলে চালকরা হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। আমাদের পাম্প এখন প্রায় বন্ধের কাছাকাছি।”
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের আব্দুল্লাহপুর এলাকার পশ্চিম পাশে অবস্থিত আরএসআর ফিলিং স্টেশনেও একই দৃশ্য দেখা গেছে। সেখানকার বিক্রয়কর্মী জানে আলম জানান, দুপুর ১টার দিকে খুব অল্প সময়ের জন্য গ্যাসের চাপ ছিল, কিন্তু দ্রুতই তা চলে গেছে। অন্যদিকে, ডেমরার রাসেল ফিলিং ও সিএনজি স্টেশনে এবং হাজী সিএনজি ফিলিং স্টেশনে দিনভর যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। প্রেশার ফলের কারণে রাসেল ফিলিং স্টেশন তাদের চারটি হোসের মধ্যে মাত্র একটি সচল রাখতে পেরেছে। মীরপাড়া এলাকার হাজি ফিলিং স্টেশনেও প্রেশার ফলের কারণে মাত্র একটি হোস পাইপ দিয়ে গ্যাস ফিলিং করা হচ্ছে, যার ফলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেকে গ্যাস না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। যাত্রাবাড়ী থেকে ডেমরায় আসা সিএনজিচালক মো. সারোয়ার আরিফ ক্ষোভের সাথে প্রশ্ন করেন, “আমরা কি এভাবে পরিবারসহ না খেয়ে মরব?”
ইউরেকা সিএনজি ফিলিং স্টেশনে প্রাইভেটকারের দীর্ঘ লাইনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েছিলেন আবুল কালাম। মহাখালী বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি এই সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে তিনি হতাশার সুরে জানান, কত ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে তার কোনো ঠিক নেই। মহাখালী বাসস্ট্যান্ড এলাকার এবিএন সিএনজি ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার শহীদুল জানান, গ্যাসের চাপ এতই কম যে কিছুক্ষণ সরবরাহ করার পর অটোমেটিক সিস্টেম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এরপর আবার কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চালু করতে হয়—এভাবেই চলছে পুরো প্রক্রিয়া।
রাজধানীর মালিবাগ, মুগদা, বিশ্বরোড, মতিঝিল, মানিকনগর, খিলগাঁও, সবুজবাগ, বনশ্রী এবং গোড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে একই পরিস্থিতি। যেসব স্টেশন চালু রয়েছে, সেখানেও স্বল্পচাপের কারণে অত্যন্ত ধীরগতিতে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। মালিবাগ হাজীপাড়া সিএনজি ফুয়েলিং স্টেশন, বিশ্বরোডের শান্ত সিএনজি রি-ফুয়েলিং স্টেশন, আরকে মিশন রোডের এন.এস. সিএনজি ফিলিং অ্যান্ড সার্ভিসিং সেন্টার এবং মানিকনগরের বেস্ট ইস্টার্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনসহ বিভিন্ন পাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ সারি এখন নিত্যদিনের দৃশ্য। কোথাও সীমিত পরিসরে সরবরাহ চলছে, আবার কোথাও সাময়িকভাবে সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, জ্বালানি সংকটের এই চরম বাস্তবতায় রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থা এবং নিম্নবিত্ত চালকদের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।















