শ্রমিক-শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের জোরালো দাবি জানিয়েছে ‘গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি’। শুক্রবার (২১ আগস্ট) রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক বিশাল সমাবেশে এই দাবি জানানো হয়। সমাবেশে শ্রমিক-শিল্প বাঁচাতে কর্মী ছাঁটাই বন্ধ করা, জ্বালানি খাতের সংকট নিরসন করে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, শ্রম আইন ২০২৬-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠন ও শ্রম বিধি প্রণয়নের দাবিতে সোচ্চার হন অংশগ্রহণকারী শ্রমিক ও নেতৃবৃন্দ। উক্ত সমাবেশে সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও শাখা পর্যায়ের অসংখ্য নেতা এবং সাধারণ শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। সমাবেশ শেষে একটি বিশাল মিছিল পল্টন এলাকা প্রদক্ষিণ করে, যেখানে শ্রমিকদের দাবিগুলো রাজপথে প্রতিধ্বনিত হয়।
সমাবেশনটি সভাপতিত্ব করেন গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান এবং শ্রম সংস্কার কমিশনের (২০২৪)-এর সদস্য তাসলিমা আখতার। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা ও সভাপরিচালনা করেন সংগঠনের সহসভাপ্রধান নুরুল ইসলাম। সভায় পর্যায়ক্রমে বক্তব্য রাখেন তাসলিমা আখতার, মিজানুর রহিম চৌধুরী, সহসভাপতি নুরুল ইসলাম, প্রচার প্রকাশনা সম্পাদক হযরত বিল্লাল, কেন্দ্রীয় নেতা সাবিনা আক্তার, মামুন ইসলামসহ বিভিন্ন শাখা পর্যায়ের নেতৃত্ব। এছাড়া সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন আউটসোর্সিং কর্মচারী কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নুরুল হক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলিফ দেওয়ান এবং বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি সৈকত আরিফ।
সমাবেশের বক্তারা তাদের বক্তব্যে গভীর উদ্বেগের সাথে বলেন, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এই সময়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির চরম অস্থিরতার কারণে পোশাক শ্রমিক এবং সামগ্রিক শিল্প খাত নানামুখী সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের ফলে এই খাতের উৎপাদন সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বক্তারা উল্লেখ করেন যে, বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিকাঠামো এবং তাদের সহযোগী প্রভাবশালী মালিকপক্ষের অপতৎপরতার কারণে শ্রমিকের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে এবং সামগ্রিক শ্রম খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর চূড়ান্ত প্রভাব হিসেবে ইতোমধ্যে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক তাদের কর্মসংস্থান হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে, গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে পোশাকশিল্পের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বক্তারা স্পষ্টভাবে বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি হলো বর্তমান অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বা প্রাণ। এই খাতের স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে প্রায় ৪০ লাখ পোশাক শ্রমিকসহ কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের জান-জীবিকার প্রশ্ন এবং দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের ভবিষ্যৎ। জ্বালানি সংকটের কারণে শুধু শিল্প উৎপাদনই কমছে না, বরং শ্রমিকদের প্রাত্যহিক জীবনও হয়ে উঠেছে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তাই শ্রমিক ও শিল্পের বৃহত্তর স্বার্থে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। তারা আরও সতর্ক করে বলেন, একদিকে জ্বালানি সংকট এবং অন্যদিকে বিভিন্ন কারখানায় অকারণে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, শতাধিক কারখানা বন্ধ হওয়ার পর পুনরায় কিছু কারখানা চালু হলেও অনেক শ্রমিক এখনো কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতিতে মালিকপক্ষ যেন কোনো ধরনের অযৌক্তিক অজুহাতে শ্রমিক ছাঁটাই করতে না পারে, সে বিষয়ে সরকারকে কঠোর নির্দেশনা প্রদানের আহ্বান জানান বক্তারা।
নেতৃবৃন্দ সতর্ক করে বলেন, কর্মহারা শ্রমিকদের জন্য দ্রুত কর্মসংস্থান এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা না করা হলে শ্রমিক শ্রেণি এবং সামগ্রিক শ্রম খাত উভয়ই চরম বিপদে পড়বে। শ্রমিকদের এই অসহায়ত্ব ও বিপদকে পুঁজি করে ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলো পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে এবং গণঅভ্যুত্থানের অর্জিত অর্জনগুলোকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র করতে পারে। এ বিষয়ে শ্রমিক, মালিক এবং সরকার—এই তিন পক্ষকেই সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়।
সভায় আরও আলোচনা করা হয় নবনির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের প্রণীত শ্রম আইন ২০২৬ নিয়ে। নেতৃবৃন্দ বলেন, এই আইনের মাধ্যমে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার বৃদ্ধি, মজুরি মূল্যায়নের সময়সীমা ৫ বছর থেকে কমিয়ে ৩ বছর করা, বিপজ্জনক কাজ প্রত্যাখ্যানের অধিকার প্রদান, যৌন নিপীড়ন বিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন এবং শ্রমিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ কর্তৃপক্ষ গঠন করার মতো অনেক ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা শ্রমিকদের জন্য বড় প্রাপ্তি। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, নানা জটিলতার কারণে এই পূর্ণাঙ্গ আইনটি এখনো বাস্তবে বাস্তবায়িত হয়নি। আইনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুত প্রয়োজনীয় গেজেট প্রকাশ এবং বিধি প্রণয়ন করা জরুরি। একইসঙ্গে আইনের প্রয়োগ কোথাও ব্যাহত হচ্ছে কি না, তা তদারকিতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
সভাপতির বক্তব্যে তাসলিমা আখতার বলেন, ‘কেবল আইন প্রণয়ন করলেই হয় না, সেই আইনকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হয়। শ্রম আইন ২০২৬-এর যেসব ইতিবাচক পরিবর্তন শ্রমিকদের অধিকারকে শক্তিশালী করেছে, সেগুলোর বাস্তবায়নে গড়িমসি করলে এই আইনটি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে। শ্রমিকদের সংগঠন করার অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, বৈষম্য ও হয়রানি থেকে সুরক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অবিলম্বে এই আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন প্রয়োজন।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন কমে গেলে তার সবচেয়ে বড় বোঝা বইতে হবে সাধারণ শ্রমিকদের। শিল্পের অব্যবস্থাপনা বা জ্বালানি সংকটের দায় যেন শ্রমিকদের ঘাড়ে চাপিয়ে তাদের ছাঁটাই করা না হয়। মনে রাখতে হবে, শ্রমিককে রক্ষা করেই এই শিল্পকে রক্ষা করা সম্ভব।’
মজুরি বোর্ড গঠন প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, শ্রম আইন ২০২৬-এ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে, যেখানে প্রতি তিন বছর পর পর মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘ অপেক্ষার পরিবর্তে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতার পরিবর্তনের সাথে সাথে শ্রমিকের মজুরি সমন্বয় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বর্তমান সময়ে তীব্র মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে, এমতাবস্থায় মজুরি সমন্বয় না হলে শ্রমিকরা বাস্তবে চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়বেন। তাই আইনগত বিধান অনুযায়ী দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠন এবং ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ প্রক্রিয়া শুরু করার দাবি জানান তারা।
সবশেষে, বক্তারা সাধারণ শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা কোনো ধরনের প্ররোচনা বা ফ্যাসিবাদী শক্তির ফাঁদে পা না দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এবং গণতান্ত্রিক উপায়ে তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন চালিয়ে যান। একইসঙ্গে মালিকপক্ষ এবং সরকারকে অনুরোধ করা হয়, শ্রমিক ও শিল্পের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থে শ্রমিকদের অধিকার খর্ব না করে তাদের সর্বোচ্চ সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য।















