প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে এবং বিদ্যালয়ে তাদের উপস্থিতি ও আগ্রহ বাড়াতে শ্রীলঙ্কা ও ভারতের তামিলনাড়ুর সফল অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে বাংলাদেশেও মায়েদের সম্পৃক্ততায় রান্না করা খাবার পৌঁছে দেওয়ার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে খুব শিগগিরই একটি পাইলট কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
আজ বুধবার (২৬ আগস্ট) চাঁপাইনবাবগঞ্জের শহীদ সাটু হলে আয়োজিত ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিডিং কর্মসূচি’ শীর্ষক প্রকল্পের ওরিয়েন্টেশন এবং প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রধান শিক্ষকগণের সাথে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
খাবার সরবরাহের মডেল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় বাজার থেকে টাটকা শাকসবজি, ডিম, মাছসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর উপকরণ সংগ্রহ করে মায়েদের তত্ত্বাবধানে রান্না ও বিতরণের মাধ্যমে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। তিনি উল্লেখ করেন যে, খাবার পৌঁছে দেওয়ার পদ্ধতি একাধিক হতে পারে, তবে সরকারের মূল লক্ষ্য একটাই—প্রতিটি শিশুর কাছে সঠিক সময়ে নিরাপদ, মানসম্মত ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা।
মিড-ডে মিল কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে ববি হাজ্জাজ বলেন, মাদারস কমিটির কার্যকর নজরদারির ফলে এই প্রকল্পের অনিয়ম এবং বিভিন্ন অভিযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে মায়েদের সরাসরি সম্পৃক্ততা খাবারের গুণগত মান রক্ষা, সঠিক সরবরাহ এবং বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করছে। তিনি প্রতিটি বিদ্যালয়ের মাদারস কমিটিকে আরও সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়ে বলেন, খাবারের গুণগত মান, গন্ধ বা স্বাদে কোনো অসঙ্গতি দেখা গেলে তা তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানাতে হবে। মায়েদের এই সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই মিড-ডে মিল প্রকল্প শিশুদের জন্য আরও নিরাপদ ও স্বচ্ছ হয়ে উঠছে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুটি প্রধান লক্ষ্য হলো—দেশের কোনো শিশু যেন বিদ্যালয়ের বাইরে না থাকে এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থী যেন মানসম্মত শিক্ষা লাভ করতে পারে। এই দুটি লক্ষ্য বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে মাঠপর্যায়ের শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের ওপর। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, শ্রেণি কার্যক্রমের উন্নয়ন, শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং অনুকূল শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধা প্রসঙ্গে ববি হাজ্জাজ জানান, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষকদের দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যালয়ের বাইরে থেকে প্রশিক্ষণ নিতে হবে না, যা বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট দূর করতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি মূল্যায়নভিত্তিক পদোন্নতি, নতুন বদলি নীতি এবং শিক্ষকদের পেশাগত উৎকর্ষ সাধনের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকার শিক্ষকদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উৎসাহিত করতে নির্দিষ্ট বিদ্যালয়ভিত্তিক দুর্গম ভাতা প্রদানের বিষয়ে নতুন নীতিমালায় ব্যবস্থা রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষক ও জনবল সংকট নিরসনে তিনি বলেন, শূন্য পদ পূরণ, নতুন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নিশ্চিত করার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়গুলোতে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সহায়তার জন্য নাইটগার্ড ও এমএলএসএসসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়নে প্রতিমন্ত্রী জানান, নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে যেসব বিদ্যালয় বারবার স্থান পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকে, সেসব এলাকার জন্য বিশেষ ‘স্থানান্তরযোগ্য অবকাঠামো’ মডেল নিয়ে কাজ করছে মন্ত্রণালয়। দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত বিভিন্ন সফল মডেল পর্যালোচনা করে তা সরকারিভাবে প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সবশেষে ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক সংস্কারের জন্য পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কারিকুলাম, দক্ষ শিক্ষক, কার্যকর মনিটরিং, উন্নত অবকাঠামো এবং প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার—এই পাঁচটি ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারলে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা সঠিক পথে এগিয়ে যাবে। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে কেবল একটি বিষয়ে পরিবর্তন আনলে হবে না, বরং পাঠ্যক্রমকে যুগোপযোগী করা, দায়িত্বশীল শিক্ষক নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানোই হবে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি।
















