রংপুরের কামালকাছনা মাছুয়াপাড়ায় (দাসপাড়া) শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় এখন দুটি পরস্পরবিরোধী তথ্যের লড়াই চলছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের আনুষ্ঠানিক রিপোর্ট অনুযায়ী, নিহত মা ও মেয়ের শরীরে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তবে এই তথ্যের বিপরীতে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর দাবি। ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (ডোম) শ্রী যতন দাবি করেছেন যে, নিহত প্রার্থী চক্রবর্তীর শরীরে ধর্ষণের চিহ্ন ছিল।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সন্ধ্যায় রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস এই বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ফরেনসিক রিপোর্টটি ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং আজ সকাল ১১টায় তা জমা দেওয়া হয়েছে। যদিও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এখনো রিপোর্টটি সংগ্রহ করেননি, তবে আগামীকাল সেটি নেওয়া হতে পারে। ধর্ষণের অভিযোগ প্রসঙ্গে ডা. বাবলু স্পষ্ট করে বলেন, "আমরা এই বিষয়ে বলার মতো কোনো প্রমাণ পাইনি। প্রাইভেট পার্টে কোনো আঘাত বা ইনজুরি পাওয়া যায়নি। এমনকি ভ্যাজাইনাল সোয়াব সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠানো হলেও তার ফলাফল নেগেটিভ এসেছে।"

এদিকে, একটি গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, ডোম শ্রী যতন ধর্ষণের আলামত পাওয়ার কথা স্বীকার করছেন। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, "মেয়েটির শরীর থেকে বীর্য বের হয়েছে, যা আমি সংগ্রহ করে রেখেছি। কিন্তু এই কথাগুলো বাইরে বলা যাবে না।"

যখন তাকে প্রশ্ন করা হয় যে, ধর্ষণ হয়ে থাকলে ডাক্তার কেন তা গোপন করলেন, তখন তিনি উত্তর দেন, "ডাক্তারের গোপন কথা বাইরে বলা যায় না। ডাক্তার রিপোর্ট লিখবেন এক কথা, আর আমি বলব অন্য কথা; তাহলে তো সমস্যা হবে।"

এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ডা. বাবলু কিশোর জানান, সোয়াব নেওয়ার সময় হয়তো ওই কর্মচারীর মনে হয়েছিল যে পরীক্ষায় কিছু পাওয়া যেতে পারে, আর সেই ধারণার বশেই তিনি এমন মন্তব্য করেছেন। তবে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় কোনো প্রমাণ মেলেনি।

ঘটনার সূত্রপাত গত শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে। পুলিশ কামালকাছনা-মাছুয়াপাড়ার ওই বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, ২৫ বছর বয়সী মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এবং ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর রোববার ভোরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ নামে দুই যুবককে আটক করা হয়। পরবর্তীতে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর করা একটি মামলার প্রেক্ষিতে পুলিশি তদন্ত শুরু হয়।

রোববার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক কারণ ও বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। পুলিশ কমিশনার জানান, অভিযুক্ত মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের একটি ভবনের ছাদ দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করে এবং সেখানে মাদক সেবন করতে থাকে। এই সময় গণপতি চক্রবর্তী ছাদে উঠে তাদের মাদক সেবন করতে দেখলে বাধা দেন। পুলিশের দাবি, নিজেদের মাদক সেবনের কথা অন্যদের জানিয়ে দেওয়ার আশঙ্কায় দুই যুবক তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। তারা সঙ্গে থাকা গামছা দিয়ে গণপতির গলা পেঁচিয়ে ধরে এবং ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয়।

গণপতির চিৎকার এবং ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু সিঁড়িতেই তাকে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এরপর মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী যখন সামনে আসেন, তাকেও একইভাবে হত্যা করা হয়। সবশেষে ঘরে থাকা ১২ বছর বয়সী শিশু আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকেও হত্যা করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, প্রিয়ম আসামিদের চিনত, তাই ভবিষ্যতে সে এই হত্যাকাণ্ডের কথা ফাঁস করে দিতে পারে—এই আশঙ্কায় তাকেও খতম করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ওই বাড়ির ওয়াশরুমে গোসল করে এবং পুনরায় মাদক সেবন করে। এরপর তারা পুরো বাড়ি তল্লাশি করে স্বর্ণালংকার চুরি করে। তদন্তে জানা গেছে, অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ একটি সোনার দোকানে কাজ করে, তাই সে আগুনের সাহায্যে স্বর্ণের বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করে আসল সোনাগুলো আলাদা করে নেয়। শুক্রবার জুমার নামাজের সময় যখন আশেপাশের মানুষ মসজিদে যান, তখন তারা পাশের বাড়ির ছাদ দিয়ে নিঃশব্দে পালিয়ে যায়।

তদন্তে আরও এক অদ্ভুত তথ্য উঠে এসেছে। পালানোর আগে অভিযুক্তরা ডাইনিং টেবিলে বসে বয়ামে রাখা খেজুর খেয়েছিল এবং মাদকের প্রভাব কমানোর জন্য ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খেয়েছিল। বর্তমানে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং বিস্তারিত তথ্যের জন্য সিআইডির ল্যাব পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে তদন্তকারী পুলিশ।