সিলেটের মাটি থেকে উঠে আসা এক তরুণের অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং কঠোর পরিশ্রমের গল্প এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর মতো একটি অভিজাত সংস্থায় যোগ দিয়ে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন পংকজ তালুকদার। বর্তমানে তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ইঞ্জিনিয়ার কোরে’ একজন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার এই অভাবনীয় অর্জনের কথা জানাজানি হওয়ার পর দেশজুড়ে, বিশেষ করে তার জন্মভূমি সিলেটে বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মাঝে বয়ে গেছে আনন্দের জোয়ার।
পংকজ তালুকদারের এই যাত্রার শুরু হয়েছিল সিলেটের পরিচিত আঙিনায়। স্থানীয় হাতিম আলী উচ্চবিদ্যালয় এবং এমসি কলেজে তার প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয়। এরপর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে নিউইয়র্কের নামকরা প্রতিষ্ঠান ‘সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক’ (CUNY) থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। সামরিক জীবনে প্রবেশের আগে পংকজ পেশায় ছিলেন একজন দক্ষ কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। প্রযুক্তির জগতে ক্যারিয়ার গড়লেও তার মনে ছিল চ্যালেঞ্জিং কোনো পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তার পারিবারিক শিকড় মিশে আছে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায়।
তবে মার্কিন সেনাবাহিনীর সদস্য হওয়া এবং বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ার কোরে কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা মোটেও সহজ কোনো পথ ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে পংকজ জানিয়েছেন, এই যাত্রার প্রতিটি ধাপ ছিল অগ্নিপরীক্ষার মতো। শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং কঠোর সামরিক শৃঙ্খলার এক কঠিন সংমিশ্রণের মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে।
প্রশিক্ষণের দিনগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে পংকজ জানান, তার রুটিন ছিল অত্যন্ত কঠোর। প্রতিদিন ভোর ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে শুরু হতো তার দিনের প্রথম প্রশিক্ষণ সেশন, যা শেষ হতো রাত ৮টা থেকে ৯টার দিকে। দীর্ঘ সময় ধরে চলে এই প্রক্রিয়া। পর্যাপ্ত ঘুম বা বিশ্রামের সুযোগ ছিল নেই বললেই চলে। প্রতিদিন তাকে নিজের শারীরিক ও মানসিক সহনশীলতার সর্বোচ্চ পরীক্ষা দিতে হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণ ছিল আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং। পংকজ জানান, প্রায় ১১০ ডিগ্রি ফারেনহাইট প্রচণ্ড উত্তাপের মধ্যে টানা চার দিন তাকে জঙ্গলে অবস্থান করতে হয়েছে। অসহ্য গরম, বিষাক্ত সাপ, পোকামাকড় এবং চরম শারীরিক ক্লান্তির মধ্যেও তাকে প্রশিক্ষণের প্রতিটি নিয়ম নিখুঁতভাবে পালন করতে হয়েছে। সামরিক কৌশলের অংশ হিসেবে এম৪ রাইফেল দিয়ে লক্ষ্যভেদে গুলি চালানো, জীবন্ত গ্রেনেড নিক্ষেপ, মাইন শনাক্তকরণ এবং বিভিন্ন দুর্গম প্রাকৃতিক বাধা অতিক্রম করার মতো কঠিন প্রশিক্ষণগুলো তিনি সফলভাবে সম্পন্ন করেন।
প্রায় পাঁচ মাসের এই কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণের ফলে তার শরীরের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। কঠোর পরিশ্রম ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণে তার ওজন কমে যায় প্রায় ২৬ পাউন্ড। প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার দৌড় ছিল তার রুটিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কাঁধে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ পাউন্ড ওজনের ভারী ব্যাগ বহন করে টানা ১০ মাইল হাঁটার স্মৃতি তিনি ভুলতে পারবেন না। অনেক সময় মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যেও এই দীর্ঘ পথচলা চালিয়ে যেতে হয়েছে। শরীর ভিজে একাকার হয়ে গেলেও থামার কোনো সুযোগ ছিল না।
মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার মুহূর্তগুলো ছিল আরও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। পংকজের ভাষায়, “অনেক সময় শরীর মনে করত আর পারছি না, মন চাইত একটু বিশ্রাম নিতে। কিন্তু সামরিক জীবন মানেই হলো হার না মানা। তখন নিজেকেই বারবার সাহস দিয়েছি, মনে করিয়ে দিয়েছি যে এই কষ্ট সাময়িক কিন্তু সাফল্য স্থায়ী।” শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি পরিবার ও পরিচিত পরিবেশ থেকে দূরে থাকা ছিল তার জন্য বড় মানসিক চ্যালেঞ্জ। প্রশিক্ষণের সময় মুঠোফোনের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত সীমিত। কখনো কখনো মাত্র ৩০ মিনিটের জন্য ফোন ব্যবহারের সুযোগ মিলত, আর সেই সংক্ষিপ্ত সময়েই তাকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে মানসিক শক্তি সঞ্চয় করতে হতো।
দীর্ঘ লড়াই এবং অদম্য সংকল্পের পর পংকজ এখন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর গর্বিত সদস্য। পেছনে ফিরে তাকালে তিনি উপলব্ধি করেন, নির্ঘুম রাত, অঝোর ঘাম এবং সীমাহীন শারীরিক কষ্টই তাকে আজকের এই সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। এই কঠিন সময়ে যারা তাকে সাহস জুগিয়েছেন এবং মানসিকভাবে পাশে ছিলেন, তাদের প্রতি তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে পংকজ বলেন, “বেসামরিক জীবন থেকে শুরু হওয়া আমার এই যাত্রা এখন এক নতুন মোড় নিয়েছে। আজ আমি গর্বের সাথে বলতে পারি যে, আমি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একজন সদস্য। এই পথ সহজ ছিল না, কিন্তু প্রতিটি কষ্ট আজ সার্থক মনে হচ্ছে। কষ্ট ছিল সাময়িক, তবে এই অর্জনের গর্ব থাকবে চিরদিন।”
সিলেট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা, প্রযুক্তির দুনিয়ায় ক্যারিয়ার শুরু করা এবং সবশেষে কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ পেরিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কোরে কর্মকর্তা হওয়া—পংকজ তালুকদারের এই জীবনযুদ্ধ এখন তার পরিচিতজন এবং আগামীর প্রজন্মের কাছে পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও অধ্যবসায়ের এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।




















