মাফিকুল ইসলাম,
খড়ির বোঝা কাঁধে নিয়ে জঙ্গল থেকে ফিরছেন এক নারী। সঙ্গে তার ছোট ছোট সন্তান। ক্লান্ত শরীর, বিষণ্ন মুখ আর চোখেমুখে সংসারের দুশ্চিন্তা—দৃশ্যটি যেন অভাবের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
এটি কোনো গল্প নয়; দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার ১০ নম্বর হরিরামপুর ইউনিয়নের পাঁচপুকুর মৌজার বাস্তব চিত্র।
শুকতারা প্রিয়া। স্বামীর সংসার থেকে বঞ্চিত এই নারী এখন সন্তান ও অসুস্থ-বয়স্ক বাবাকে নিয়ে জীবনযুদ্ধ করছেন। সংসারে নিয়মিত আয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই সন্তানদের মুখে দু’মুঠো খাবার তুলে দিতে কখনো মানুষের বাগানে শ্রম দেন, কখনো দিনমজুরি করেন, আবার কখনো জঙ্গল থেকে খড়ি সংগ্রহ করেন।
তার সংসারের চিত্র আরও করুণ। জরাজীর্ণ ঘর, অনিশ্চিত খাবার, চিকিৎসার সংকট—সব মিলিয়ে প্রতিটি দিনই তাদের কাছে বেঁচে থাকার পরীক্ষা।
কিন্তু এই পরিবারের সবচেয়ে বড় সংকট শুধু আজকের খাবার নয়; আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।
শুকতারা প্রিয়ার শিশু সন্তানদের এখন স্কুলে যাওয়ার কথা। হাতে থাকার কথা বই-খাতা, পিঠে থাকার কথা স্কুলব্যাগ। অথচ বাস্তবতা তাদের মায়ের সংগ্রামের সঙ্গী করে তুলেছে।
দারিদ্র্যের কারণে একটি শিশুর শৈশব যখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়, তখন ক্ষতিটা শুধু একটি পরিবারের থাকে না—ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ।
স্থানীয়রা বলছেন, শুকতারা প্রিয়া সন্তানদের নিয়ে যে জীবনযাপন করছেন, তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক হওয়ার কথা নয়। একজন মা বাধ্য হয়ে শ্রমে নামছেন, আর তার সঙ্গে সন্তানদেরও অনিশ্চিত পরিবেশে থাকতে হচ্ছে।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও সরকারি সহায়তার আওতায় প্রকৃত অসহায় পরিবারগুলোকে যদি সময়মতো অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তাহলে কি শুকতারা প্রিয়ার মতো মাকে সন্তান কাঁধে নিয়ে জঙ্গলে ছুটতে হতো?
তাদের দাবি, বিষয়টি দ্রুত প্রশাসনের নজরে আনা হোক। উপজেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা বিভাগের কর্মকর্তারা সরেজমিনে পরিবারটির অবস্থা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন।
বিশেষ করে শিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা, খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসা এবং একটি নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
কারণ একটি শিশুকে স্কুলে ফিরিয়ে দেওয়া মানে শুধু তাকে বই দেওয়া নয়—তার সামনে একটি নতুন ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেওয়া।
শুকতারা প্রিয়া হয়তো নিজের ভাগ্যের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছেন। কিন্তু তার সন্তানদের ভাগ্যও কি একই অভাবের চক্রে আটকে থাকবে?
আজ যদি সমাজ নীরব থাকে, কাল এই শিশুগুলোর হারিয়ে যাওয়া শৈশব ফিরিয়ে আনার সুযোগ আর নাও থাকতে পারে।
তাই এলাকাবাসীর আকুতি—এই প্রতিবেদনটি যেন শুধু সংবাদ হয়ে না থাকে। প্রশাসনের দৃষ্টি পড়ুক, জনপ্রতিনিধিরা এগিয়ে আসুন, সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষগুলো পাশে দাঁড়ান।
একটি পরিবারের জন্য হয়তো সামান্য সহায়তা খুব বড় কিছু নয়; কিন্তু সেই সহায়তাই একটি শিশুর জীবনে হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।
খড়ির বোঝা নামুক মায়ের কাঁধ থেকে।
শিশুদের হাতে উঠুক বই।
জীবিকার তাগিদে হারিয়ে যাওয়া শৈশব ফিরে পাক তারা।
শুকতারা প্রিয়ার পরিবারের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সহানুভূতির নয়—প্রয়োজন বাস্তব সহায়তার।
সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে এখন একটাই প্রশ্ন—আর কতদিন একটি মা সন্তান কাঁধে নিয়ে খড়ি কুড়িয়ে সংসার চালাবেন?











