চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতার প্রার্থিতা বাতিলের রায়ের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে সীতাকুণ্ড এলাকা। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সরকারি গাছ কেটে সড়ক অবরোধের ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলায় পুলিশ ইতিমধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। বুধবার সীতাকুণ্ড মডেল থানায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের একজন কর্মকর্তা বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন, যেখানে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তারকৃত দুজনের পরিচয় গোপনীয় রাখা হয়েছে, যা পরবর্তীতে জানানো হবে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার আপিল বিভাগের রায় ঘোষণার পর থেকেই আসলাম চৌধুরীর সমর্থকরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বিক্ষোভে নামেন। মঙ্গলবার দুপুর থেকেই উত্তজনা শুরু হয় এবং বিকেলে তা চরম আকার ধারণ করে। ছোট দারোগারহাট, কুমিরা, বাড়বকুণ্ড ও বাঁশবাড়িয়াসহ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে ইলেকট্রিক করাত ব্যবহার করে সড়কের পাশের সরকারি গাছ কেটে গুঁড়িসহ মহাসড়কের ওপর ফেলে দেওয়া হয়। এর ফলে তৈরি হয় এক দীর্ঘ ব্যারিকেড। পাশাপাশি টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভকারীরা।

এই আকস্মিক অবরোধের ফলে ঢাকামুখী এবং চট্টগ্রামমুখী উভয় লেনে যান চলাচল সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ে। ছোট দারোগারহাট থেকে শুরু করে কুমিরা, বাড়বকুণ্ড ও বাঁশবাড়িয়া পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। মহাসড়কে আটকা পড়ে দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান এবং শত শত ব্যক্তিগত গাড়ি। দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকায় চরম ভোগান্তির শিকার হন সাধারণ যাত্রী। অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে গন্তব্যের দিকে রওনা হন। এই যানজটে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন কর্মজীবী মানুষ, পরীক্ষার্থী এবং জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স। জরুরি সেবার যানবাহনগুলো মহাসড়কের এই অচলাবস্থায় আটকা পড়ে চরম সংকটের মুখে পড়ে।

খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেন। তারা মহাসড়ক থেকে কাটা গাছ সরিয়ে যান চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করেন। বর্তমানে সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।

ওসি মহিনুল ইসলাম আরও জানান, প্রার্থিতা বাতিলের রায়ের পর বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা পরিকল্পিতভাবে কয়েকটি স্থানে গাছ ফেলে মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন। সরকারি সম্পদ নষ্ট এবং গাছ কাটার অভিযোগে সওজ বিভাগের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং বাকি আসামিদের শনাক্ত করতে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে, আদালতের এই রায়ের পর আইনি জটিলতা আরও ঘনীভূত হয়েছে। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। চট্টগ্রাম-৪ আসনে পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে নাকি অন্য কাউকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে, তা নির্ভর করবে ওই পূর্ণাঙ্গ রায়ের ওপর।

উল্লেখ্য যে, গত ৩ ফেব্রুয়ারি আনোয়ার সিদ্দিকীর করা একটি আপিলের শুনানি শেষে আপিল বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে আসলাম চৌধুরীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে সেই সঙ্গে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই আসনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৫ জুন মামলার রায় ঘোষণার তারিখ ৩০ জুন ধার্য করা হয়। অবশেষে মঙ্গলবার ঘোষিত রায়ে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা চট্টগ্রাম-৪ আসনের নির্বাচনী বিরোধে এক নতুন মোড় সৃষ্টি হয়েছে।