নিয়োগ-পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, উন্নয়ন প্রকল্পে আর্থিক কারচুপি এবং চার দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নতুন করে অনুসন্ধান শুরুর বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) এক ফেসবুক লাইভে এসে তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এটি মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি প্রক্রিয়া, যার লক্ষ্য তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং তাকে মানসিকভাবে হয়রানি করা।

ফেসবুক লাইভে আসিফ মাহমুদ নিজের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগের যৌক্তিক খণ্ডন করার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে চার দেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটিকে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে যথাক্রমে ৫ হাজার ৫০০ কোটি, ৩ হাজার কোটি, ২ হাজার কোটি ও ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের যে অঙ্কগুলো উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো অত্যন্ত সন্দেহজনকভাবে ‘রাউন্ড ফিগার’ বা পূর্ণ সংখ্যায় দেখানো হয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ কীভাবে এবং কোন হিসেবে নির্ধারণ করা হলো, সেই বিষয়ে তিনি দুদকের কাছে স্বচ্ছতা দাবি করেন এবং প্রশ্ন তোলেন যে, এমন সুনির্দিষ্ট ও বড় অঙ্কের হিসাবের পেছনে কোনো বাস্তব প্রমাণ আছে কি না।

একটি নির্দিষ্ট পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে দুদকের অনুসন্ধানের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে আসিফ মাহমুদ সময়ের হিসাব তুলে ধরেন। তিনি জানান, যে পদোন্নতির কথা বলা হচ্ছে, তা চলতি বছরের মে মাসে বিএনপি সরকারের আমলে সম্পন্ন হয়েছে। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, ওই সময় তিনি পদত্যাগ করার কয়েক মাস পর এবং বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় তিন মাস পর উক্ত পদোন্নতি কার্যকর হয়। এমতাবস্থায়, ওই প্রক্রিয়ার জন্য তাকে কীভাবে দায়ী করা হচ্ছে, তা নিয়ে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং একে অযৌক্তিক বলে অভিহিত করেন।

দুদকের মুখপাত্রের একটি মন্তব্য নিয়েও কথা বলেন সাবেক এই উপদেষ্টা। তার দাবি, দুদকের মুখপাত্র শুরুতে অভিযোগের বিষয়ে ‘প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে’ বলে মন্তব্য করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে সেটিকে ‘স্লিপ অব টাং’ বা কথা বলার ভুল হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই বিভ্রান্তিকর মন্তব্যের প্রেক্ষিতে আসিফ মাহমুদ আইনি নোটিশ পাঠালেও এখন পর্যন্ত কোনো সন্তোষজনক জবাব পাননি বলে তিনি জানান।

শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বলেন, প্রকল্পের পরিধি বাড়ানো, প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ এবং নতুন অবকাঠামো যুক্ত করার ফলে স্বাভাবিকভাবেই ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই প্রকল্পটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একনেক (ECNEC) কর্তৃক যথাযথ প্রক্রিয়ায় অনুমোদিত হয়েছে এবং এর কাজ এখনো চলমান রয়েছে। তাই ব্যয় বৃদ্ধিকে অনিয়ম হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি দাবি করেন।

দুদকের অনুসন্ধানের সূত্র হিসেবে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে আসিফ মাহমুদ অভিযোগ করেন, তার বিরুদ্ধে ওঠা নতুন অভিযোগগুলোর সাথে ওই প্রতিবেদনের তথ্য এবং অর্থের অঙ্কের হুবহু মিল রয়েছে। তিনি গণমাধ্যমের কিছু শিরোনামের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, দুদক যেখানে কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরুর কথা বলেছে, সেখানে কিছু সংবাদমাধ্যম শিরোনামে অর্থ পাচারের বিষয়টি যেন প্রমাণিত হয়ে গেছে—এমনভাবে উপস্থাপন করেছে। তিনি মনে করেন, এর মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে একটি ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ তৈরি করার চেষ্টা চলছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

আসিফ মাহমুদ আরও দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে এই পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার পেছনে কয়েকজন উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত অসন্তোষ এবং প্রতিশোধ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে। যদিও তিনি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেননি, তবে অভিযোগের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার কথা স্পষ্টভাবে জানান। চার দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘দেশের বাইরে কোথাও আমার এক টাকা বিনিয়োগের প্রমাণ পাওয়া গেলে আমি সেদিন রাজনীতি ছেড়ে দেব। আপনারা শুধু প্রমাণ করে দেখান, আমি দেশের বাইরে এক টাকা বিনিয়োগ করেছি বা এক ধূলিকণাও কিনেছি।’

নিজের পরিবারের সদস্যদের এই অভিযোগে টেনে আনার বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তিনি জানান, তার দুই ভগ্নিপতি রয়েছেন বলে অভিযোগ করা হলেও বাস্তবে তার একজনই ভগ্নিপতি। এছাড়া তার ভাগ্নের বয়স মাত্র আড়াই থেকে তিন বছর। এত ছোট একটি শিশুকেও অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগে জড়ানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন, যা তার মতে চরম অমানবিক ও হাস্যকর।

সবশেষে সাধারণ জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সাবেক উপদেষ্টা বলেন, কেবল সংবাদ শিরোনাম দেখে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর জন্য। তিনি অনুরোধ করেন, অভিযোগের পাশাপাশি তার বক্তব্যগুলোও শুনে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দেখার জন্য।

উল্লেখ্য, গত ১১ ফেব্রুয়ারি ‘দৈনিক আজকের কণ্ঠ’-এর ফেসবুক পেজে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে মোট ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। ওই পোস্টে দেশভেদে অর্থের যে অঙ্ক উল্লেখ করা হয়েছিল, দুদকের বর্তমান অনুসন্ধানের অভিযোগেও প্রায় একই অঙ্ক ও দেশগুলোর নাম পাওয়া গেছে। ওই একই পোস্টে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পে কমিশন, উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য এবং ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও করা হয়েছিল, যার মধ্যে শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের বিষয়টিও ছিল। পরবর্তীতে দুদকের অনুসন্ধানের তথ্যের সাথে ওই ফেসবুক পোস্টের মিল পাওয়া যাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। সোমবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে আসিফ মাহমুদ দাবি করেন, আওয়ামী লীগের ‘প্রোপাগান্ডা পেজ’ হিসেবে পরিচিত ওই পেজের তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই দুদকের বর্তমান অনুসন্ধান চলছে। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানাতেই তিনি সন্ধ্যায় ফেসবুক লাইভে আসেন।