বাংলাদেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে প্রথমবারের মতো বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর এক বিশাল উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই যুগান্তকারী প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হবে। ‘নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে বৈদ্যুতিক ট্রাকশন প্রবর্তন’ শীর্ষক এই প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা।
প্রকল্পটির বিশাল আর্থিক প্রয়োজনীয়তা মেটাতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোও বড় ধরনের সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জানা গেছে, এই প্রকল্পের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি) থেকে উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে মোট ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা পাওয়া যাবে। সরকার এই অত্যন্ত महत्वाकांक्षी প্রকল্পটি ২০৩১ সালের ৩০ জুনের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা
বর্তমানে বাংলাদেশের রেল নেটওয়ার্ক মূলত ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ দেখা দিচ্ছে। প্রকল্প প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, পুরোনো ও প্রযুক্তির দিক থেকে পিছিয়ে থাকা ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের কারণে ট্রেনগুলো কাঙ্ক্ষিত গতি ও সক্ষমতা অর্জন করতে পারছে না। এর ফলে যাত্রীদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সংখ্যক ট্রিপ পরিচালনা করাও বর্তমান সময়ে বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ঢাকা এবং এর পার্শ্ববর্তী গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে এই রুটটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট লিংক হিসেবে কাজ করতে পারে। এই সমস্যাগুলো নিরসনে এবং আধুনিক ও দ্রুতগতির যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বৈদ্যুতিক ট্রেনের বিকল্প নেই।
বিদ্যুতায়িত রেলপথ ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়
প্রকল্পের আওতায় নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটের বিদ্যমান ডিজেলচালিত ট্রেন পরিচালনা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হবে। এই পরিবর্তনের জন্য রেললাইনের ওপর ‘ওভারহেড ওয়্যার’ বা বৈদ্যুতিক তার স্থাপন করা হবে। এছাড়া নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট দূরত্বে বিশেষায়িত ‘ট্রাকশন সাবস্টেশন’ নির্মাণ করা হবে।
রেলপথটিকে আরও নিরাপদ ও মসৃণ করতে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ‘ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট’ (ইএমইউ) ট্রেন, উন্নত মানের বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন এবং অত্যাধুনিক কম্পিউটারভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। বৈদ্যুতিক ট্রেনের একটি অন্যতম প্রধান সুবিধা হলো এর দ্রুত গতি ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা। ডিজেলচালিত ট্রেনের তুলনায় বৈদ্যুতিক ট্রেন অনেক দ্রুতগতিতে চলতে পারে এবং স্টেশনে আসার পর অত্যন্ত দ্রুত থামতে পারে। ফলে স্টেশনে থামার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ট্রেনটি পুনরায় তার সর্বোচ্চ গতিতে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। এতে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে যাতায়াতের সময় বর্তমান সময়ের তুলনায় অর্ধেকেরও বেশি কমে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুফল
বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় ৩ হাজার ৯৩ কিলোমিটার বিস্তৃত রেল নেটওয়ার্কে মূলত ডিজেলচালিত ট্রেন চলাচল করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বৈদ্যুতিক ট্রেনের ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিনিয়োগ কিছুটা বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অনেক কম হবে। এটি একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা। কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হলে এর পরিচালনা ব্যয় প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে এই ব্যবস্থাটি কার্বন নিঃসরণ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে, যা পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের রেলওয়ের উদাহরণটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ভারত তাদের বিশাল রেল নেটওয়ার্কের আধুনিকায়নে ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে। ২০২৩ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত তাদের ৬৫ হাজার ৩০০ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেল নেটওয়ার্কের প্রায় ৯০ শতাংশ, অর্থাৎ ৫৮ হাজার ৮১২ কিলোমিটার এলাকা ইতিমধ্যে সফলভাবে বিদ্যুতায়ন করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটেও বৈদ্যুতিক ট্রেন
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটের পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটেও বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। গত ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন যে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বৈদ্যুতিক ট্রাকশন চালুর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সম্ভাব্যতা যাচাই এবং বিস্তারিত নকশার কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হকের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পরপরই এই প্রকল্পের বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটেও বৈদ্যুতিক ট্রেন চলাচল করবে, যা ট্রেনের গড় গতি বৃদ্ধি করবে এবং যাত্রীদের যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে।















