সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে নিয়োগ-পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্যসহ টেন্ডার এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল আর্থিক অনিয়ম ও চার দেশে অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগগুলোর বিষয়ে নতুন করে নিবিড় অনুসন্ধান পরিচালনা করছে। তবে দুদকের এই অনুসন্ধানের প্রক্রিয়াটি শুরু হওয়ার পর থেকেই এক বিতর্ক দানা বেঁধেছে। অভিযোগ করা হচ্ছে যে, দুদকের বর্তমান অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্যের সঙ্গে প্রায় সাত মাস আগে নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ফেসবুক পেজ ‘দৈনিক আজকের কণ্ঠ’-এর একটি পোস্টের অদ্ভুত মিল রয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, যা জনমনে ব্যাপক কৌতূহল ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এই পুরো বিষয় নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন আসিফ মাহমুদ। তিনি ওই ফেসবুক পেজটিকে আওয়ামী লীগের একটি ‘প্রোপাগান্ডা পেজ’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং তার বিরুদ্ধে আনা যাবতীয় অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেন। নিজের পোস্টে আসিফ মাহমুদ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, আওয়ামী লীগের ওই প্রোপাগান্ডা পেজ থেকে তার বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের যে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তোলা হয়েছিল, দুদকের বর্তমান অনুসন্ধানেও ঠিক একই ধরনের অভিযোগের মিল পাওয়া যাচ্ছে। এই রহস্যজনক মিল এবং অভিযোগের সত্যতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে তিনি ওইদিন সন্ধ্যায় ফেসবুক লাইভে আসার কথা জানান।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুদকের প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া এবং সুইজারল্যান্ড—এই চারটি দেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ অনুযায়ী, দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এই চার দেশের অঙ্কের সমষ্টি করলে মোট অর্থ পাচারের পরিমাণ দাঁড়ায় ঠিক ১১ হাজার কোটি টাকা।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত ১১ ফেব্রুয়ারি ‘দৈনিক আজকের কণ্ঠ’ নামক ফেসবুক পেজটি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ঠিক একই চার দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ এনেছিল। সেই পোস্টেও দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের কথা হুবহু উল্লেখ করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ওই পোস্টে আরও দাবি করা হয়েছিল যে, পাচার করা এই অর্থ দিয়ে দুবাইয়ে বিলাসবহুল ভিলা ও ফ্ল্যাট কেনা হয়েছে, সিঙ্গাপুরে ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ি ও হোটেল কেনা হয়েছে এবং সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রাখা হয়েছে।
প্রায় আট মাস আগে প্রকাশিত একটি ফেসবুক পোস্টের সঙ্গে দুদকের বর্তমান অনুসন্ধানের তথ্যের এমন অবিশ্বাস্য মিল থাকায় নেটিজেনদের মধ্যে তুমুল আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন যে, একটি প্রোপাগান্ডা পেজের তথ্যের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় তদন্ত সংস্থার অনুসন্ধানের এতটা মিল কীভাবে সম্ভব। রোববার ওই পুরনো পোস্টটি পুনরায় সামনে এনে এক নেটিজেন মন্তব্য করেছেন, ‘প্রোপাগান্ডা ফেসবুক পেজ আজকের কণ্ঠ গত ফেব্রুয়ারিতেই কোনো শক্ত প্রমাণ বা তথ্যসূত্র ছাড়াই আসিফের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ এনেছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, দুদক আট মাস পর এসে হুবহু সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
এদিকে দুদকের বর্তমান অনুসন্ধানে কেবল অর্থ পাচার নয়, বরং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন টেন্ডার বাণিজ্যের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। উল্লেখ্য, সাত মাস আগে প্রকাশিত ওই বিতর্কিত ফেসবুক পোস্টেও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পে কমিশন গ্রহণ, উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য এবং ঠিকাদারি চক্র নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ করা হয়েছিল। এমনকি শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগটিও ওই পোস্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, যা এখন দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।















