লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের নকশা প্রকাশ: চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এপিএম টার্মিনালসের
বিশ্বজুড়ে বন্দর ও টার্মিনাল পরিচালনায় শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস সম্প্রতি চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের প্রস্তাবিত নকশা (লেআউট) এবং পরিচালনার বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ করেছে। বর্তমানে বিশ্বের ৬০টিরও বেশি বন্দর ও টার্মিনাল সফলভাবে পরিচালনা করা এই প্রতিষ্ঠানের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর কেন্দ্রিক লজিস্টিকস অবকাঠামোতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে সংস্থাটি ২০২৬ সালের শেষের দিকে এই টার্মিনালটির নির্মাণকাজ শুরুর পরিকল্পনা পুনর্ব্যক্ত করেছে। এর মাধ্যমে ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের এই মেগা প্রকল্পের প্রথম বিস্তারিত ধারণা পাওয়া গেল।
প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগে নির্মিত কনটেইনার টার্মিনাল। এই অত্যাধুনিক টার্মিনালের বার্ষিক সক্ষমতা হবে ৮ লাখ টিইইউ-র (টুয়েন্টি ফুট ইকুইভ্যালেন্ট) বেশি। হিসাব অনুযায়ী, এই নতুন টার্মিনালটি চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে বন্দরে দীর্ঘদিনের বিদ্যমান জট কমবে, পণ্য খালাসের গতি বাড়বে এবং সামগ্রিকভাবে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় হ্রাস পাবে, যা দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক এই টার্মিনাল অপারেটর তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকল্পটির নকশা এবং প্রযুক্তিগত দিকগুলো বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করেছে। সেখানে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে এই টার্মিনাল বাংলাদেশের নৌ-সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এবং বড় আকারের জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি করে চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্রমকে আধুনিকায়ন করবে। উল্লেখ্য, গত বছরের ১৭ নভেম্বর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) মডেলের আওতায় টার্মিনালটির নকশা তৈরি, অর্থায়ন, নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে এপিএম টার্মিনালস বিভি। ওই চুক্তির কয়েক মাস পরেই এখন এই বিস্তারিত তথ্য ও নকশা প্রকাশ করা হলো।
প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা এবং নকশা চূড়ান্তকরণ প্রসঙ্গে এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার সিইও রমেশ ডেভিড টিবিএস-কে জানান, পরিকল্পনা পর্যায়েই প্রাথমিক নকশা ও ধারণাপত্র তৈরি করা হয়েছিল, যা বর্তমানে আরও পরিমার্জন ও চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। তিনি বলেন, 'লালদিয়া টার্মিনালের প্রাথমিক নকশা ও ধারণা পরিকল্পনা পর্যায়েই প্রস্তুত করা হয়েছিল। প্রথমত, বিনিয়োগের খসড়া তৈরির জন্য এবং দ্বিতীয়ত, এই বিনিয়োগের মাধ্যমে আমরা ঠিক কী অর্জন করতে চাই তার একটি পরিষ্কার রূপরেখা পেতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমাদের টিম এখন চূড়ান্ত নকশা নিয়ে কাজ করছে। পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে যথাযথ সমন্বয় নিশ্চিত করতে আমরা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাব।'
নির্মাণকাজ শুরুর সময়সীমা সম্পর্কে রমেশ ডেভিড জানান, প্রতিষ্ঠানটি যত দ্রুত সম্ভব কাজ শুরু করতে আগ্রহী। তবে এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বেশ কিছু রেগুলেটরি অনুমোদন ও ছাড়পত্র নিতে হয়। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন ও ছাড়পত্র সময়মতো পাওয়া গেলে ২০২৬ সালের শেষের দিকে নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে। ঠিকাদার নির্বাচনের বিষয়ে তিনি জানান, এপিএম টার্মিনালসের বৈশ্বিক প্রকিউরমেন্ট টিমের তত্ত্বাবধানে একটি স্বচ্ছ, প্রত্যক্ষ এবং প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্য ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হবে।
টার্মিনালের এই নকশা প্রকাশকে স্বাগত জানিয়েছেন ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। চট্টগ্রাম চেম্বার অভ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, এই বিনিয়োগ বাংলাদেশের সমুদ্র যোগাযোগ ও বাণিজ্য খাতের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে। তিনি আরও বলেন, 'চট্টগ্রামকে একটি আঞ্চলিক লজিস্টিকস হাবে পরিণত করার যে ভিশন এপিএম টার্মিনালস দেখিয়েছে, তার জন্য আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।' তিনি মনে করেন, আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো অপরিহার্য এবং আন্তর্জাতিক মানের বন্দর পরিচালনা ব্যবস্থা ও দক্ষতা এই টার্মিনালের মাধ্যমে আসলে তা অন্যান্য টার্মিনালগুলোর সেবার মান উন্নত করতেও সহায়তা করবে।
প্রকাশিত লেআউট অনুযায়ী, লালদিয়া টার্মিনালটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে এটি ৬ হাজার টিইইউ পর্যন্ত ধারণক্ষমতার বড় কনটেইনার জাহাজ হ্যান্ডেল করতে পারে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে যে জাহাজগুলো ভিড়তে পারে, তার তুলনায় এটি প্রায় দ্বিগুণ ক্ষমতা। এই টার্মিনালে ১০.৫ মিটার ড্রাফটের ৬১৩ মিটার দীর্ঘ একটি জেটি থাকবে। আধুনিক প্রযুক্তির এই টার্মিনালে সাতটি শিপ-টু-শোর ক্রেন, ৩২টি বিদ্যুৎচালিত রাবার টায়ারযুক্ত গ্যান্ট্রি ক্রেন (ইআরটিজিএস) এবং ৪১টি বিদ্যুৎচালিত টার্মিনাল ট্রাক্টর (ইটিটিএস) স্থাপন করা হবে। প্রতিষ্ঠানটি আশা করছে, ২০৩০ সালের মধ্যে টার্মিনালটি পুরোপুরি কার্যকর হবে।
এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বড় আকারের মেইনলাইন কনটেইনার জাহাজ সরাসরি চট্টগ্রামে ভিড়তে পারবে, যা কার্গো হ্যান্ডলিং দক্ষতা ও শিপিংয়ের নির্ভরযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে সাধারণত ২ হাজার ৭০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ ভিড়তে পারে, ফলে বেশিরভাগ পণ্য ছোট ফিডার জাহাজে পরিবহন করতে হয়। এর ফলে পণ্যগুলো ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় পৌঁছানোর আগে কলম্বো বা সিঙ্গাপুরের মতো আঞ্চলিক হাব বন্দরগুলোতে ট্রান্সশিপমেন্ট (পণ্য স্থানান্তর) করতে হয়, যা সরবরাহ চেইনে অতিরিক্ত ৭ থেকে ১৪ দিন সময় বাড়িয়ে দেয়।
এপিএম টার্মিনালসের মতে, ছোট ফিডার জাহাজের ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে পণ্য দুবার ওঠানো-নামানোর প্রয়োজন হয়, যা লজিস্টিকস খরচ বাড়িয়ে দেয় এবং আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করে। নতুন টার্মিনাল চালু হলে এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সরাসরি মেইনলাইন জাহাজগুলো চট্টগ্রামে আসতে পারবে, ফলে ট্রানজিট সময় এবং সামগ্রিক লজিস্টিকস ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
কোম্পানিটি মনে করে, এই উন্নতির ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে 'লিড টাইম' বা ক্রয়াদেশ থেকে পণ্য সরবরাহ পর্যন্ত সময় কমিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। লজিস্টিকস বাধা দূর হলে এবং সরবরাহ চেইনের দক্ষতা বাড়লে পোশাক শিল্পের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া ও পাদুকা শিল্পের মতো উদীয়মান খাতগুলোও বিশ্ববাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে। এপিএম টার্মিনালস বিশ্বাস করে, এই প্রকল্প আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগকে আরও সুদৃঢ় করবে এবং দেশের দ্রুত বর্ধনশীল বাণিজ্যের প্রসারে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।











