নওগাঁর বাজারে কাঁচা মরিচের দাম যেন আগুনের মতো জ্বলছে। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে আকাশচুম্বী হয়েছে এর দাম। বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি মরিচের দাম ২৩০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যা খুচরা বাজারে গিয়ে ঠেকেছে ৩০০ টাকায়। হঠাৎ করে দামের এই উল্লম্ফনে একদিকে যেমন কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর নওগাঁ জেলায় প্রায় ১ হাজার হেক্টর জমিতে মরিচ আবাদ করা হয়েছে। তবে বর্ষার প্রভাবে প্রায় ১০ হেক্টর জমির মরিচ আবাদ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। স্থানীয় কৃষকরা মূলত দেশি, সাদা ও আকাশি জাতের মরিচ চাষ করছেন।

নওগাঁ সদর উপজেলার কীত্তিপুর সাপ্তাহিক হাটে এখন মরিচের জয়জয়কার। শুক্রবার ও মঙ্গলবার এই হাটের দিন। ভোরের আলো ফোটার আগেই কৃষকরা তাদের উৎপাদিত মরিচ নিয়ে ভিড় জমাতে শুরু করেন। সকাল ৮টার মধ্যেই অধিকাংশ মরিচের বেচাকেনা শেষ হয়ে যায়। এই হাটে শুধু কীত্তিপুর, বর্ষাইল ও বক্তারপুর ইউনিয়ন নয়, বরং পাশের বদলগাছী উপজেলার বালুভরা ইউনিয়নের কৃষকরাও তাদের ফসল বিক্রি করতে আসেন। বর্তমানে এই হাটে প্রকারভেদে মরিচ ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দাম বাড়ায় কৃষকদের মুখে এখন হাসি। ধারণা করা হচ্ছে, প্রতি হাটে এখন প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার মরিচ কেনাবেচা হচ্ছে।

মরিচের এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে প্রতিকূল আবহাওয়া। তিন সপ্তাহ আগে প্রবল বৃষ্টিতে সবজিসহ মরিচের আবাদ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে করে মরিচের উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে এবং স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়েছে। মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও যেখানে মরিচের দাম ছিল কেজি প্রতি ৮০ থেকে ৯০ টাকা, তা পর্যায়ক্রমে বেড়ে এখন ২০০ টাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে।

জেলার মহাদেবপুর উপজেলার মোমিনপুর বাজার বর্তমানে জেলার সবচেয়ে বড় পাইকারি কাঁচা মরিচের হাট হিসেবে পরিচিত। এই হাটে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২২ লাখ টাকার মরিচ কেনাবেচা হয়। বছরের প্রায় ৬ থেকে ৭ মাস এই হাটটি সক্রিয় থাকে এবং প্রতি মাসে এখানে প্রায় তিন কোটি টাকার কাঁচা মরিচের লেনদেন হয়। স্থানীয় কৃষকদের মতে, সপ্তাহখানেক আগে দাম ১৩০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে থাকলেও হঠাৎ করেই তা ঊর্ধ্বমুখী হয়। অধিক বৃষ্টির কারণে নিচু এলাকার মরিচ ক্ষেতগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমেছে।

সদর উপজেলার ব্রুজরুক-আতিতা গ্রামের কৃষক রুবেলের মুখে এখন আনন্দের ছাপ। তিনি বলেন, "আমি এক বিঘা জমিতে মরিচ চাষ করেছি। গত দুই সপ্তাহ ধরে অল্প পরিমাণে মরিচ সংগ্রহ করছি। আজ হাটে ২২ কেজি মরিচ নিয়ে এসে কেজি প্রতি ২৩০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। সপ্তাহে দুই দিন মরিচ তুলছি এবং ভালো দাম পেয়ে খুব খুশি। তবে আমার মনে হয়, সামনে যখন উৎপাদন বাড়বে, তখন দাম কিছুটা কমে আসবে।"

অন্যদিকে, ক্রেতাদের অবস্থা করুণ। সোহেল নামের এক ক্রেতা আক্ষেপ করে বলেন, "অনেক দিন ধরে মরিচের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। দাম শুনেই যেন চোখ কপালে উঠে যায়। আধা কেজি মরিচ কিনতে এসে এখন মাত্র ১০০ গ্রাম কিনতে হচ্ছে। শুধু মরিচ নয়, অন্যান্য সবজির দামও এখন আকাশচুম্বী।"

পাইকারি ব্যবসায়ী রুস্তম আলী জানান, চট্টগ্রামের বাজারে সাদা মরিচের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে তিনি প্রায় ১০ লাখ টাকার কাঁচা মরিচ ক্রয় করেন। তিনজন ব্যবসায়ী মিলে প্রতি সপ্তাহে একটি ট্রাকে করে চট্টগ্রামে মরিচ সরবরাহ করেন, যার বাজারমূল্য প্রায় ২৫ থেকে ২৬ লাখ টাকা। বর্তমানে সরবরাহ কমে যাওয়ায় তাকে ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে মরিচ কিনতে হচ্ছে।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মনজুর রহমান বলেন, "বর্তমানে বাজারে মরিচের দাম বেশ ভালো, যার ফলে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। তবে বর্ষার পরিমাণ আরও বাড়লে আবাদ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করছি।"