দুর্নীতি, জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, পাসপোর্ট জালিয়াতি এবং মানবতাবিরোধী অপরাধসহ একাধিক গুরুতর মামলায় অভিযুক্ত সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে হস্তান্তরের বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মতি জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মুখপাত্র ও উপ-পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। দীর্ঘ দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কারাগারে বন্দি থাকা ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের অন্যতম এই প্রভাবশালী সহযোগীর বিরুদ্ধে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করার পর এই অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর প্রাথমিক নথিপত্র ও অভিযোগসমূহ পর্যালোচনার পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ তাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। তবে বন্দি প্রত্যর্পণের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইনি ও কারিগরি বিষয় সম্পর্কিত কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত চেয়েছে দুবাই পুলিশ। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এই তথ্যের অনুরোধে দ্রুত সাড়া দেওয়ার কাজ চলছে। পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দুবাই পুলিশের চাওয়া তথ্য-উপাত্তগুলো প্রস্তুত করার কাজ করছেন, যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়।

আইনজীবীদের মতে, সাবেক এই শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতিতে কর্মরত এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ওলোরা আফরিন জানান, মূলত চারটি সুনির্দিষ্ট বিষয় বিবেচনা করেই আমিরাতের আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। এই বিষয়গুলো হলো— অপরাধের বিষয়ে যথাযথ ও অকাট্য তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, দুই দেশের প্রচলিত আইনের সামঞ্জস্যতা যাচাই, আদালতে তথ্যের সঠিক উপস্থাপন এবং কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা। এই ধাপগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হলে বেনজীর আহমেদের প্রত্যর্পণ সহজ হবে বলে তিনি মনে করেন।

সম্প্রতি সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ সরকার বিশ্বাস করে যে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনা খুব বেশি কঠিন হবে না। তিনি উল্লেখ করেন, দুই দেশের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি থাকুক বা না থাকুক, জাতিসংঘ সনদ (ইউএন চার্টার) অনুযায়ী বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত উভয় দেশই কিছু আন্তর্জাতিক নিয়মাবলির স্বাক্ষরকারী। এই সনদের আওতায় আগেও অনেক আসামি প্রত্যর্পণ করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ থেকেও অপরাধীদের ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাই এই প্রক্রিয়াটি খুব বেশি জটিল হবে না বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

উল্লেখ্য যে, ইন্টারপোল রেড নোটিশের মাধ্যমে বিদেশে পলাতক অপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে আনার সফল নজির বাংলাদেশে রয়েছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও এর আগে অপরাধীদের ফেরত আনা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি রয়েছে— 'সিকিউরিটি কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট' এবং 'অ্যাগ্রিমেন্ট অন দ্য ট্রান্সফার অফ সেনটেন্সড পারসনস'। এই চুক্তির আওতায় ইতিপূর্বে একাধিক অপরাধীকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

বেনজীর আহমেদের ক্যারিয়ার পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ১৪ই এপ্রিল পর্যন্ত র‍্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ওই বছরের ১৫ই এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আইজিপির পদ থেকে অবসর গ্রহণের পর স্থানীয় গণমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হয়। এরপর দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত শুরু করলে ২০২৪ সালে তিনি গোপনে দেশ ছেড়ে দুবাই চলে যান। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে অর্ধ ডজনেরও বেশি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে একটি মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং অপর একটি মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলছে। ২০২৫ সালে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির আবেদনের পর তার বিরুদ্ধে নোটিশ জারি হয় এবং গত ১২ই জুন দুবাইয়ের একটি শপিং মল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে স্থানীয় পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর বাংলাদেশ সরকার প্রথম দফায় দুবাই পুলিশের কাছে ১৪৪ পৃষ্ঠার বিস্তারিত নথিপত্র পাঠিয়েছে।