মানুষের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় তার চরিত্রের মাধ্যমে। সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো তার উত্তম ও নিষ্কলুষ চরিত্র। একজন মানুষ যত বড় বিদ্বান, প্রভাবশালী কিংবা ক্ষমতাবানই হোন না কেন, যদি তার চরিত্র কলুষিত হয়, তবে তিনি সমাজের চোখে নিকৃষ্ট এবং নিন্দিত হিসেবে গণ্য হন। কেবল মানুষের কাছেই নয়, মহান আল্লাহর কাছেও চারিত্রিক স্খলন অত্যন্ত অপছন্দনীয়। মানুষকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে বিপথগামী করার জন্য শয়তান সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে চারিত্রিক কেলেঙ্কারি ও প্রলোভনকে। তাই প্রতিটি মুমিনের জন্য এই বিষয়ে সর্বোচ্চ সচেতন ও সতর্ক থাকার কোনো বিকল্প নেই।
আমরা বর্তমানে এমন এক উন্মুক্ত সংস্কৃতির যুগে বসবাস করছি, যেখানে চারপাশ থেকে পাপের প্রলোভন আমাদের প্রতিনিয়ত গ্রাস করতে চাইছে। আধুনিক যুগের এই প্রমোদপ্রবণ পরিবেশে নিজের চরিত্রকে নিষ্কলুষ রাখা এখন অনেকটা জ্বলন্ত কয়লা হাতের তালুতে ধরে রাখার মতোই কঠিন ও কষ্টসাধ্য। আজ থেকে চৌদ্দশ বছরেরও বেশি আগে নবী করিম (সা.) এই বিষয়ে সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীর চেয়ে অধিক ক্ষতিকর কোনো ফিতনা আমি রেখে যাইনি’ (সহিহ মুসলিম)। তবে এই হাদিসের মর্মার্থ এই নয় যে, নারীরাই কেবল ফিতনা বা ভয়ের কারণ; বরং এটি পুরুষদের জন্য একটি বিশেষ সতর্কবার্তা, যাতে তারা নিজেদের চরিত্র, সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে। শয়তান যেকোনো মুহূর্তে নারী-সংক্রান্ত প্রলোভনের মাধ্যমে মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে। আর একবার যদি কেউ এই ফাঁদে পা দেয়, তবে তার দীর্ঘদিনের অর্জিত ইমান, আমল এবং ব্যক্তিত্ব মুহূর্তের মধ্যে ধুলোয় মিশে যেতে পারে। তাই সর্বদা আল্লাহর কাছে এই ফিতনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা প্রতিটি মুমিনের কর্তব্য।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ সফল মুমিনদের কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে নামাজের প্রতি একাগ্রতা এবং অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি বিশেষভাবে বলা হয়েছে, ‘আর যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে তারা সফল’ (সুরা মুমিনুন)। চারিত্রিক পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে নবী করিম (সা.) আমাদের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। তিনি ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও পবিত্র চরিত্রের অধিকারী। তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল সব ধরনের কলুষতা ও মলিনতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তাই একজন প্রকৃত মুমিন হতে হলে চরিত্রের নির্মলতা অর্জন করা অপরিহার্য।
বর্তমান সময়ে একজন মুমিনের জন্য নিজের চরিত্রের হেফাজত করা নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। এক্ষেত্রে আমরা হযরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবন থেকে অমূল্য শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। চরিত্র রক্ষায় তিনি এমন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীর সমস্ত যুবসমাজের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে। রাজপ্রাসাদের রুদ্ধদ্বার কক্ষে যখন এক ক্ষমতাবান ও রূপবতী নারী তাঁকে অবৈধ কাজে আহ্বান করেছিলেন, তখন প্রবল প্রলোভন ও অনুকূল পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেছিলেন, ‘আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি’ (সুরা ইউসুফ)। আল্লাহভীতির কারণেই তিনি নিজেকে সংযত রাখতে পেরেছিলেন। আজ আমরাও যদি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ‘তাকওয়া’ বা আল্লাহভীতিকে সঙ্গী করতে পারি, তবে কোনো জাগতিক প্রলোভনই আমাদের চরিত্রকে কলুষিত করতে পারবে না।
চরিত্রের হেফাজতকারী সম্পর্কে নবীজি (সা.) এক অনন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাকে তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী অঙ্গ (জিহ্বা) এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী অঙ্গ (লজ্জাস্থান)-এর হেফাজতের নিশ্চয়তা দেবে, আমি তার জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা দিচ্ছি’ (সহিহ বুখারি)। চারিত্রিক সব ধরনের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো চোখের হেফাজত। চোখ অনেকটা একটি দেশের সীমান্তের মতো। সীমান্ত যদি অরক্ষিত থাকে, তবে রাজধানী অর্থাৎ মানুষের হৃদয়কে নিরাপদ রাখা অসম্ভব। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই আল্লাহতায়ালা মুমিন পুরুষদের নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে’ (সুরা আন-নূর)।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ উপাদানগুলো আমাদের দৃষ্টিকে প্রতিনিয়ত কলুষিত করছে। মানুষ যখন একবার নিষিদ্ধ কোনো দৃশ্যের দিকে দৃষ্টি দেয়, তখন তার বিষ ধীরে ধীরে অন্তরে প্রবেশ করতে শুরু করে। ঠিক যেমন চুলকানি হলে সাময়িকভাবে আরাম মনে হয়, কিন্তু পরে সেই স্থানেই অসহ্য জ্বালাপোড়া শুরু হয়; পাপের অবস্থাও ঠিক তেমনই। এতে ক্ষণিকের বিকৃত আনন্দ থাকতে পারে, কিন্তু তার পরিণতি হয় ভয়াবহ। আল্লাহর শাস্তির ভয় তো আছেই, পাশাপাশি মনে রাখতে হবে যে, চরিত্রই হলো মানুষের ব্যক্তিত্বের মুকুট। মাথার মুকুট যেমন সবার আগে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তেমনি মানুষের চরিত্রও সবার আগে চোখে পড়ে। তাই চরিত্রের হেফাজত মানে শুধু একটি গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা নয়, বরং নিজের ইমান, ব্যক্তিত্ব, সম্মান এবং আখেরাতকে রক্ষা করা। আসুন, ফিতনার এই কঠিন যুগে আমরা চরিত্রের পবিত্রতা রক্ষায় সর্বদা সচেষ্ট থাকি। কারণ এই মুকুট অক্ষুণ্ন রাখতে পারলেই মানুষ দুনিয়ায় সম্মানীয় জীবন লাভ করে এবং আখেরাতে অর্জন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের চিরস্থায়ী সফলতা।










