রংপুর অভিমুখী লংমার্চের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে ১১ দলীয় ঐক্য। সহস্রাধিক গাড়ির এক বিশাল বহর নিয়ে আগামীকাল শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানী ঢাকা থেকে রংপুরের উদ্দেশে যাত্রা করবে এই জোট। আগামীকালের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকের পর আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এই কর্মসূচির বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখী এই লংমার্চের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। এই কর্মসূচিটি হবে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, "আমরা এই কর্মসূচিকে একটি সুশৃঙ্খল এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছি। তাই সরকার, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের প্রতি আমাদের বিনীত আহ্বান—এই কর্মসূচিতে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না করে বরং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন।"
তিনি বিশেষভাবে সরকারের প্রতি আবেদন জানান যেন এই শান্তিপূর্ণ লংমার্চের পথে কোনো অন্তরায় সৃষ্টি করা না হয়। লংমার্চে অংশগ্রহণকারী নেতাকর্মীদের প্রতি বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, "আমরা ১১ দলের সকল নেতাকর্মীদের অনুরোধ করেছি যেন তারা চরম ধৈর্য ও সংযম প্রদর্শন করেন। কোনো ধরনের উসকানিতে পা দেওয়া যাবে না। আমাদের লক্ষ্য এই গণতান্ত্রিক কর্মসূচিকে সফল করা। যদি কোনো কারণে আমরা সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হই বা আমাদের গায়ে আঘাত লাগে, তবে তার প্রতিশোধ নেওয়ার চেয়ে এই লংমার্চকে সফল করার মধ্যেই আমরা প্রকৃত সার্থকতা খুঁজে পাব।"
কর্মসূচির বিশালতার কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণের সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, "বিএনপি, ক্ষমতাসীন দল, পুলিশ প্রশাসন, সিভিল প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা, ট্রাফিক বিভাগ এবং সড়কপথের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানদারদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি যেন তারা আমাদের সহযোগিতা করেন। সহস্রাধিক গাড়ির এই বিশাল বহর যখন পথে চলবে, তখন দৈনন্দিন কাজকর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যানবাহন চলাচলে কিছুটা বিঘ্ন ঘটতে পারে। এর ফলে সাধারণ মানুষের যে ভোগান্তি হবে, তার জন্য আমরা আগাম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি এবং আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করছি।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দেশের ইতিহাসে গণতন্ত্র রক্ষা এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য অতীতে যত আন্দোলন হয়েছে, সেখানে সব শ্রেণির মানুষ অনেক কষ্ট ও দুর্ভোগ স্বীকার করেছেন। চট্টগ্রামের লংমার্চের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, "চট্টগ্রামের সেই সফল লংমার্চের কথা দেশবাসী এবং প্রশাসন মনে রেখেছে। আশা করি, রংপুর অভিমুখী লংমার্চের ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষ এবং প্রশাসন আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন এবং কর্মসূচিটি সফল করতে সহায়তা করবেন, ইনশাআল্লাহ।"
লংমার্চের প্রস্তুতি ও কর্মসূচি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে গিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, "গত আট-দশ দিন ধরে আমরা ঢাকা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা এবং রংপুর পথে মোট সাতটি জনসভা ও পাঁচটি পথসভার প্রস্তুতি নিয়েছি। মহাসড়কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল শাখার আমির, ইসলামী ছাত্রশিবির, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনসহ অঙ্গসংগঠনের কর্মীদের যথাযথ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গত রাতে আমরা এই সকল শাখার নেতাদের সঙ্গে অনলাইন মিটিং করেছি। আমরা দেখেছি যে, সাধারণ জনগণ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং এমনকি প্রশাসনিক স্তরেও আমাদের প্রতি সহানুভূতি ও সহযোগিতার মনোভাব রয়েছে। আমাদের নেতারা জানিয়েছেন যে, তারা এই লংমার্চ সফল করতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন।"
এই লংমার্চের দাবিগুলোর কথা উল্লেখ করে জামায়াত নেতা জানান, প্রথমে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের জন্য ছয়টি দাবি রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে রংপুর অভিমুখী লংমার্চ ঘোষণা করার পর সেখানে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি এবং দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আরও একটি দাবি যুক্ত করে সাত দফা করা হয়। তবে সম্প্রতি এই দাবি তালিকায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত হয়েছে।
তিনি জানান, গতকাল বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১ দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে উত্তরবঙ্গের কোটি কোটি মানুষের জীবন-মরণের সাথে জড়িত 'তিস্তা মহাপরিকল্পনা' বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয় এবং এটিকে লংমার্চের দাবির সঙ্গে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে এখন এই লংমার্চের মোট দাবি দাঁড়িয়েছে আট দফায়।
গোলাম পরওয়ার বলেন, "আমরা ইতিমধ্যে উত্তরবঙ্গের প্রতিটি প্রান্তে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছি। তিস্তা মহাপরিকল্পনার দাবি যুক্ত হওয়ায় উত্তরবঙ্গের মানুষ অত্যন্ত উল্লসিত ও আনন্দিত। তারা বিশ্বাস করছেন যে, বর্তমান সরকার এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা সংশয়ের মধ্যে রয়েছে, তা দূর হবে। আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই যেন অবিলম্বে কূটনৈতিক এবং সরকারি সব ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়।"
আগামীকালের সময়সূচি সম্পর্কে তিনি জানান, সকাল ৭টায় রাজধানীর ঐতিহাসিক মানিক মিয়া এভিনিউতে বিশাল এক সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হবে। এরপর সকাল ৮টায় ঢাকা শহরের উত্তর দিক দিয়ে টঙ্গী, গাজীপুর ও টাঙ্গাইল হয়ে বহরটি যাত্রা করবে। পথে নির্ধারিত পাঁচটি পয়েন্টে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে এবং সবশেষে বহরটি রংপুরে পৌঁছাবে।
পরিশেষে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ যেভাবে সফল হয়েছিল, উত্তরবঙ্গ অভিমুখী এই লংমার্চ তার চেয়ে কোনো দিক থেকে কম হবে না। বরং বর্তমান জনসাড়া এবং প্রস্তুতি দেখে মনে হচ্ছে, এটি আরও ব্যাপকভাবে সফল হতে যাচ্ছে, ইনশাআল্লাহ।



















