দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং জাতীয় গ্রিডে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধিতে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। প্রতিষ্ঠানটির তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপটি আগামীকাল আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে যাচ্ছে। এই কূপটি চালু হলে প্রতিদিন ১২.৫ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এটি কেবল শুরু; আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে তিতাস-২৯, ৩০, ৩১ এবং বাখরাবাদ-১১ নম্বর কূপগুলোর কাজ সম্পন্ন হলে আরও প্রায় ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হতে পারে।

বিজিএফসিএলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশীয় উৎসের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি খাতের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যেই এই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। বিএনপি সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে নতুন কূপ খনন এবং বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উন্নয়ন কার্যক্রমের যে সুফল শুরু হয়েছে, তারই অংশ হিসেবে তিতাস-২৮ কূপটি উৎপাদনে যাচ্ছে। বিজিএফসিএলের তথ্যমতে, তিতাস-২৮ কূপের খননকাজ ইতোমধ্যেই সফলভাবে শেষ হয়েছে এবং পাশাপাশি তিতাস-২৯, ৩০, ৩১ ও বাখরাবাদ-১১ কূপ খননের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। এই পাঁচটি কূপের সবকটি কার্যকর হলে আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে মোট প্রায় সাড়ে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিজিএফসিএলের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম জানান, তিতাস-২৮ নম্বর কূপটি আগামীকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের পরপরই কূপটি সরাসরি জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। তিনি উল্লেখ করেন, এই পদক্ষেপের ফলে এলএনজি আমদানির ওপর চাপ কমবে এবং দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে।

‘তিতাস ও কামতা ফিল্ডে ৪টি মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ খনন’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম জসীম উদ্দিন বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, তিতাস-২৮ নম্বর কূপের খননকাজ প্রায় এক মাস আগে সম্পন্ন হয়েছে। কূপটির মোট গভীরতা প্রায় ১৩ হাজার ফুট। উদ্বোধনের সাথে সাথেই এটি উৎপাদনে যাবে এবং জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু করবে। তিনি আরও জানান, প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিতাসসহ বেশ কয়েকটি কূপ খননের কাজ শুরু করা হয়েছে। এর মধ্যে তিতাস-২৮ প্রথম ধাপে উৎপাদনে যাচ্ছে এবং বাকি কূপগুলোর কাজও দ্রুত শেষ করে গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

গভীর অনুসন্ধান গ্যাস কূপ খনন প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব তিতাস-৩১ নম্বর কূপের বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করে বলেন, এই গভীর অনুসন্ধান কূপের খননকাজ চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল শুরু হয়েছিল। বর্তমানে কূপটির খনন গভীরতা প্রায় ৪ হাজার ৯২০ মিটারে পৌঁছেছে। কূপটির লক্ষ্যমাত্রা গভীরতা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৬০০ মিটার, তবে ভূতাত্ত্বিক কারণে এটি ১০০ মিটার কমবেশি হতে পারে। তিনি জানান, গভীরতা অত্যন্ত বেশি হওয়ায় খনন ও পরবর্তী কারিগরি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগছে। তবে কোনো ধরনের ভূতাত্ত্বিক জটিলতা দেখা না দিলে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে তিতাস-৩১-এর কাজ শেষ হবে। এই কূপটি সফল হলে সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

মাহমুদুল নবাব আরও জানান, তিতাস-২৯ নম্বর কূপের মূল খননকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং বর্তমানে লগিংসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কারিগরি কাজ চলছে। এই প্রক্রিয়া শেষ করে আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে কূপটি উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা হবে, যেখান থেকে দৈনিক প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে, তিতাস-৩০ নম্বর কূপের কাজ আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং এখান থেকেও দৈনিক ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার প্রত্যাশা করছে বিজিএফসিএল।

বিজিএফসিএলের কর্মকর্তারা আরও জানান, তিতাস-৩১-এর কাজ শেষ হওয়ার পরপরই বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের ১১ নম্বর গভীর কূপের খননকাজ শুরু হবে। এই কূপটির লক্ষ্যমাত্রা গভীরতা ৪ হাজার ৫০০ মিটার (১০০ মিটার কমবেশি হতে পারে)। সফলভাবে খনন ও পরীক্ষা সম্পন্ন হলে বাখরাবাদ-১১ থেকে দৈনিক প্রায় ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।

হিসাব অনুযায়ী, তিতাস-২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর কূপ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং বাখরাবাদ-১১ থেকে প্রায় ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর সাথে তিতাস-২৮ থেকে প্রাপ্ত সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট যোগ করলে মোট পাঁচটি কূপ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের মজুত প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে এর আনুমানিক মজুত প্রায় দেড় ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। তবে তিতাস-৩১ একটি অনুসন্ধানমূলক কূপ হওয়ায় এর মাধ্যমে নতুন গ্যাসের বিশাল মজুত আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এই কূপের মাধ্যমে আরও প্রায় দুই টিসিএফ গ্যাসের মজুত যুক্ত হতে পারে। তবে মজুতের সঠিক পরিমাণ নিশ্চিত করতে খননকাজ শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন স্তরে বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে এবং পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই চূড়ান্ত মজুতের কথা জানানো হবে।