“মাকে নিয়ে বাসায় আসো, আমি চলে যাচ্ছি”—শনিবার সকাল ১০টা ৪৯ মিনিটে শ্যালিকা সিনথিয়ার মোবাইলে আসা এই একটি মেসেজই যেন হয়ে দাঁড়ালো এক মর্মান্তিক পরিণতির ইঙ্গিত। গাজীপুর মহানগরীর পূবাইলের তালটিয়া এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ২০ বছর বয়সী আফসানা আক্তার স্নিগ্ধার লাশ। ঘরে স্ত্রীর নিথর দেহ পড়ে থাকলেও, তাকে হত্যা করে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গেছে স্বামী মেহেদী হাসান মারুফ।
অভিযুক্ত মেহেদী হাসান মারুফ (২৪) পূবাইলের খিলগাঁও এলাকার সাদেক মিয়ার ছেলে। অন্যদিকে, নিহত আফসানা আক্তার স্নিগ্ধা ছিলেন ওই এলাকার ব্যবসায়ী আফসার উদ্দিনের বড় সন্তান। মাত্র দেড় মাস আগে ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করেছিলেন স্নিগ্ধা। কিন্তু সেই ভালোবাসার মানুষটিই শেষ পর্যন্ত তার জীবনের ইতি টেনে দিল।
স্নিগ্ধার ছোট বোন সিনথিয়া (১৮) জানান, তার বোন মেহেদীকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। প্রায় দুই বছর আগে মেহেদী যখন সৌদি আরবে পাড়ি জমান, তখনো তাদের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এরপর ছয় মাস আগে মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মেহেদী দেশে ফিরে দেড় মাস আগে কাজী অফিসে কাবিননামা সম্পন্ন করেন। তবে এই সম্পর্কের পথ সহজ ছিল না। মেহেদীর নেশাগ্রস্ত স্বভাবের কারণে স্নিগ্ধার পরিবার তাকে কখনোই পছন্দ করেনি। এমনকি মেহেদীর বাবা-মাও এই বিয়ে মেনে নেননি। ফলে বাধ্য হয়ে তারা আলাদা ভাড়া বাসায় সংসার শুরু করেন। সিনথিয়া বলেন, যার হাত ধরে সংসার করার স্বপ্ন সার্থক করতে চেয়েছিলেন, কে জানত ভালোবাসার সেই মানুষরূপী স্বামীর হাতেই বোনকে জীবন দিতে হবে! তিনি অভিযুক্ত মেহেদীর ফাঁসি দাবি করেছেন।
বাবা আফসার উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, তার দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে সবার বড় ছিলেন স্নিগ্ধা। কলেজে যাওয়া-আসার পথে মেহেদীর সঙ্গে তার মেয়ের পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক হয়। কিন্তু মেহেদীর নেশার অভ্যাসের কারণে তারা তাকে পছন্দ করতেন না। দুই বছর আগে সে সৌদি আরব চলে যায় এবং ফোনে যোগাযোগ রাখত। বিষয়টি তার অজানা থাকলেও, ছয় মাস আগে মেয়েটি গোপনে তাকে বিয়ে করে। বিয়ের পর মেহেদী দেশে এসে কাবিননামা করলেও পারিবারিক অমিলের কারণে তারা আলাদা বাসায় থাকেন। তিনি আরও জানান, স্নিগ্ধা প্রায়ই তাকে ফোনে বলতেন যে, পারিবারিক বিষয় নিয়ে মেহেদী তার সঙ্গে ঝগড়াঝাটি এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে।
শনিবার সকাল ১১টার দিকে তিনি জানতে পারেন, ভাড়া বাসা থেকে তার মেয়ের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্তে জানা গেছে, সকাল ১০টা ৪৯ মিনিটে সিনথিয়াকে মেসেজ পাঠানোর আগেই ১০টার দিকে মেহেদী তার ব্যাগ ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যান। তাকে বের হতে দেখে ওই বাসার অন্যান্য ভাড়াটিয়ারা। ধারণা করা হচ্ছে, নিরাপদ স্থানে পৌঁছেই সে শ্যালিকাকে ওই মেসেজটি পাঠিয়েছিল। ঘটনার পর থেকে মেহেদীর মোবাইল ফোন বন্ধ এবং তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরিবারের আশঙ্কা, স্ত্রীকে হত্যা করে সে পুনরায় বিদেশে পালিয়ে গেছে।
পূবাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, ভাড়া বাসার অন্যান্য বাসিন্দারা ঘরের খাটের ওপর স্নিগ্ধার নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে থানায় খবর দেন। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে স্নিগ্ধাকে হত্যা করে পালিয়ে গেছে স্বামী মারুফ। পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারে চেষ্টা করছে।

















