কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপকের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমের মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ পুরো এলাকা। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে লালমাই সানন্দা পাহাড়ের পার্শ্ববর্তী জঙ্গল এলাকা থেকে ১৩ বছর বয়সী অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এবং স্বরাষ্ট্র সচিবকে ফোন করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এমপি মনিরুল হক চৌধুরী। তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি স্বরাষ্ট্র সচিবকে ফোন করছেন। ফোনে নিজের পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি মনিরুল হক চৌধুরী বলছি। ভাই, দুঃখিত যে আমি কান্নার মধ্যে কথা বলছি... আপনি কি জানেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে কী ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে?’ তিনি পরিস্থিতির ভয়াবহতা বর্ণনা করে দ্রুততম সময়ে দোষীদের আইনের আওতায় আনার জন্য আকুতি জানান। জবাবে অপর প্রান্ত থেকে স্বরাষ্ট্র সচিব জানান, বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং তিনি রিপোর্টটি পেয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় এমপি মনিরুল হক বলেন, ‘পরিস্থিতি একেবারে অসহনীয়। বিষয়টি দেখার জন্য অনেক ধন্যবাদ।’
এর আগে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের পর তার বাসায় গিয়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সম্মুখীন হন এমপি মনিরুল হক। অপ্রতীমের মা, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমকে দেখে স্তব্ধ হয়ে যান সবাই। ছেলেকে হারানোর শোকে তিনি কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়েন। বিলাপ করতে করতে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে? আমি এই কুমিল্লায় চাকরি করতে এসেছি, এটা কি আমার অন্যায়? আমার ছোট্ট ছেলেটার কী দোষ ছিল? আমি শুধু এর উত্তর চাই। এটা কোন দেশ?’ ড. নাহিদা বেগম কেবল বিচার নয়, বরং তার সন্তানের এমন অকাল মৃত্যুর কারণ জানতে চান। তিনি অত্যন্ত অসহায়ভাবে বলেন, ‘আমার তো একটাই ছেলে। তাকে ছাড়া আমি কীভাবে জীবন কাটাবো? কেউ কি আমাকে বলতে পারেন আমি কীভাবে বেঁচে থাকবো?’ মায়ের এই আর্তনাদ শুনে এমপি মনিরুল হক চৌধুরীও নিজেকে সামলাতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি কেবল এটুকুই বলতে পারেন, ‘এর কোনো জবাব আমার কাছে নেই মা।’
নিখোঁজের প্রায় ২০ ঘণ্টা পর অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অপ্রতীম বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার একজন ব্যবসায়ী। গত শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার নিজ বাসভবন থেকে মায়ের মোবাইল ফোনটি নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার উদ্দেশ্যে বের হয় অপ্রতীম। এরপর আর তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লে তার বাবা কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাস্থলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় মানুষের ঢল নামে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করেছে। দুপুর পৌনে ৩টার দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে এমপি মনিরুল হক চৌধুরী পুলিশকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আটক করার নির্দেশ দেন। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি রকিবুল ইসলাম জানান, ‘আমরা অনেকটা নিশ্চিত যে, মোবাইল ফোনের জন্যই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।’ এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ইতোমধ্যে তুহিন নামের এক যুবককে আটক করা হয়েছে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অপ্রতীমের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।



















