কামরুজ্জামান

রাজধানীর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ আজমপুর-মোল্লারটেকের ইরশাল এলাকায় ‘রফিক ভিলা’ নামে একটি ভবন নির্মাণকে ঘিরে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জানা যায়, রাজউকের অনুমোদন না নিয়েই ২০২০ সালের দিকে ভবনটির ৩ তলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়। এরপর ২০২৬ সালে পুরোনো কাঠামোর ওপর আরও দুই তলা নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভবনটির নকশা রাজউকে জমা দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে অনুমোদন পাওয়া যায়নি—এমন দাবি ভবন মালিকদের একাংশের। এরপর ২০১৭ সালের ২৩ আগস্ট তৎকালীন দক্ষিণখান আদর্শ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম তোফাজ্জাল হোসেনের স্বাক্ষরিত একটি ‘ইমারত নির্মাণের অনাপত্তি সনদপত্র’ নেওয়া হয়।

ওই সনদে সংশ্লিষ্ট জমির বিবরণ উল্লেখ করে ইমারত নির্মাণে অনাপত্তির কথা বলা হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—রাজউকের অনুমোদন না থাকলে ইউনিয়ন পরিষদের এমন একটি সনদ কি ঢাকায় ভবন নির্মাণের আইনগত অনুমোদনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে? আরও বড় প্রশ্ন, সনদটি দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রশাসনিক ও নগর কর্তৃপক্ষের অবস্থান কী ছিল এবং ওই সনদের আইনগত ভিত্তিই বা কী?

সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দক্ষিণখানসহ সংশ্লিষ্ট এলাকা ডিএনসিসির সম্প্রসারিত এলাকার অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে নতুন ওয়ার্ড কাঠামোয় মোল্লারটেক, ইরশাল ও আজমপুর ডিএনসিসির ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত হয়।

এ অবস্থায় ২০১৭ সালে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দেওয়া ওই অনাপত্তি সনদের আইনগত ক্ষমতা ও কার্যকারিতা কী ছিল—তা স্পষ্ট করা জরুরি।

কারণ, স্থানীয় একটি অনাপত্তি সনদ যদি রাজউকের অনুমোদনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে ভবনটি নির্মিত হলো এবং সেই অনুমোদনের নথি কোথায়?

এলাকাবাসীর অভিযোগ, দক্ষিণখান মৌজার ২১২ ইরশাল, বর্তমান বাড়ি-৭৭, রোড-১, ডিএনসিসি ওয়ার্ড-৫০, ডিসিএম দাগ ৭৩৮৫ ও ডিসিএস দাগ ১৭৩৫৮-এর প্রায় ৩ কাঠা জমিতে স্থানীয়ভাবে ‘রফিক ভিলা’ নামে পরিচিত ভবনটি নির্মাণ করেন রফিক।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২০ সালের দিকে ভবনটি তিন তলা পর্যন্ত নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়। এরপর ২০২৬ সালে রাজউকের নতুন কোনো অনুমোদন ছাড়াই পুরোনো ভবনের ওপর আরও দুই তলা নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়েছে।

এই অংশটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—তিনতলা ভবনের ওপর আরও দুই তলা নির্মাণের আগে পুরোনো ভবনের ভিত্তি, কলাম, বিম, ফাউন্ডেশন এবং মাটির ধারণক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না।

পুরোনো কাঠামোর নকশা ও বর্তমান নির্মাণের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, নতুন লোড বহনের জন্য কাঠামো প্রকৌশলগতভাবে সক্ষম কি না—এসবের কোনো প্রকৌশলগত মূল্যায়ন হয়েছে কি না, তা প্রকাশ করা জরুরি।

এদিকে, অনুসন্ধানের সময় ভবনটির মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে প্রয়াত রফিকের বড় ছেলে সুমন সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরপর তাঁর বোনের জামাই জার্মানপ্রবাসী সাইফুল ইসলাম প্রতিবেদককে একটি ভয়েস রেকর্ড পাঠান। ওই রেকর্ডে তিনি সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই বলে দাবি করেন। একইসঙ্গে ভবনটির বিষয়ে কেউ কথা বললে তাদের উঠিয়ে এনে বিচার করা হবে বলেও হুমকি দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুতর বিষয়—ওই ভয়েস রেকর্ডে সাইফুল দাবি করেন, রাজউকের লোকজন ভবনটি দেখতে এলে তাদের ‘ম্যানেজ’ করা হয়েছে এবং রাজউক আর ব্যবস্থা নিতে আসবে না।

এই বক্তব্য দ্বারা শুধু ভবন মালিকপক্ষের নয়; প্রশ্ন উঠে রাজউকের মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন, নজরদারি, নোটিশ প্রদান এবং আইন প্রয়োগের প্রক্রিয়া নিয়েও।

এদিকে, ভবনটির ইঞ্জিনিয়ার রেজাউল করিম অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতার কথা স্বীকার করলেও একইসঙ্গে তিনি রাজউকের ইমারত পরিদর্শক সোহেলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কথা উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন, সোহেলের পরামর্শেই তিনতলার ওপর আরও দুই তলা নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।

অন্যদিকে রাজউকের ইমারত পরিদর্শক সোহেলের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁর দাবি, ভবনটি পরিদর্শনে গেলে মালিকপক্ষের একজন তাঁর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং ঢাকা-১৮ আসনের বর্তমান এমপির ঘনিষ্ঠজন পরিচয় দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব দেখানোর চেষ্টা করেন।

দুই পক্ষের এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এখন রাজউকের নথিভিত্তিক ব্যাখ্যাকে আরও জরুরি করে তুলেছে।

রাজউকের কাছে এলাকাবাসীর প্রশ্ন- ভবনটির কোনো অনুমোদিত নকশা আদৌ আছে কি না? অনুমোদন না থাকলে ২০২০ সালের দিকে তিনতলা ভবন নির্মাণ কীভাবে সম্পন্ন হলো? ২০২৬ সালে আরও দুই তলা নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে কি না? হয়ে থাকলে সেই অনুমোদনের নথি কোথায়? ইমারত পরিদর্শক সোহেল ভবনটি কবে পরিদর্শন করেছেন, তাঁর পরিদর্শন প্রতিবেদনে কী উল্লেখ ছিল এবং কোনো নোটিশ দেওয়া হয়েছিল কি না? এবং ভবনটির বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম শনাক্ত হয়ে থাকলে এতদিনে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?

Building Construction Act, 1952-এর প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী অনুমোদনবিহীন বা অনুমোদিত নকশার শর্ত লঙ্ঘন করে নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নোটিশ প্রদান, নির্মাণকাজ বন্ধ এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এরপরও এমন নির্মাণের তথ্য রাজউকের নজরে আসার পরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?—এ প্রশ্ন এখন জনস্বার্থ ও কর্তৃপক্ষের জবাবদিহির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

২০২৬ সালে ভবনটির ওপর আরও দুই তলা নির্মাণের অভিযোগের কারণে শুধু অনুমোদনের প্রশ্ন নয়, জননিরাপত্তার প্রশ্নটিও সামনে এসেছে।

তিনতলা পুরোনো কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত দুই তলা নির্মাণের আগে ভবনের structural capacity, foundation, column, beam, soil condition এবং প্রয়োজনীয় প্রকৌশলগত মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই করার দাবি এলাকাবাসীর।

ইতিপূর্বে দক্ষিণখান-মোল্লারটেক এলাকায় নকশাবহির্ভূত ও অনুমোদনহীন ভবনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে রাজউকের অভিযান পরিচালিত হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়—‘রফিক ভিলা’র মতো একটি ভবনে প্রথমে অনুমোদনের জটিলতা থাকার দাবি, পরে তিনতলা নির্মাণ এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালে আরও দুই তলা নির্মাণের অভিযোগ—এসব বিষয়ে রাজউক নিরব কেন? আর যদি কোনো কর্মকর্তা ভবনটির অনিয়ম সম্পর্কে অবগত থেকেও ব্যবস্থা না নিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর দায়িত্ব ও জবাবদিহিও তদন্তের আওতায় আসা উচিত বলে দাবি স্থানীয়দের।

২০১৭ সালের ইউনিয়ন পরিষদের অনাপত্তি সনদ যদি থাকে, তাহলে রাজউকের অনুমোদন কোথায়? আর রাজউকের অনুমোদন যদি না থাকে, তাহলে ওই সনদের ভিত্তিতে ভবন নির্মাণের বৈধতা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো?

একটি ভবনের মালিকপক্ষের ব্যক্তিগত প্রভাব, রাজনৈতিক পরিচয়, স্থানীয় কোনো অনাপত্তি কিংবা কারও মৌখিক আশ্বাস নির্মাণ আইন ও রাজউকের অনুমোদনের বিকল্প হতে পারে না।

তাই ‘রফিক ভিলা’র ক্ষেত্রে ২০১৭ সালের অনাপত্তি সনদের আইনগত ভিত্তি, রাজউকের অনুমোদন-সংক্রান্ত নথি, মূল ও সংশোধিত নকশা, নির্মাণের সময়কাল, ইমারত পরিদর্শকের প্রতিবেদন, ২০২৬ সালের অতিরিক্ত দুই তলার অনুমোদন এবং ভবনটির কাঠামোগত নিরাপত্তা—সবকিছু নথিভিত্তিক তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।

একই সাথে ভয়েস রেকর্ডের মাধ্যমে সাংবাদিককে হুমকির বার্তা পাঠানো এবং রাজউকের লোকজনকে ‘ম্যানেজ’ করার বিষয়টিও দ্রুত তদন্ত পূর্বক অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জোড় দাবি এলাকাবাসীর।