সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল অনুমোদনের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। আগামী সোমবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মন্ত্রিসভা বৈঠকে নতুন পে-স্কেলের প্রস্তাবটি উত্থাপিত হতে পারে বলে জানা গেছে। ওইদিন মন্ত্রিসভার অনুমোদন মিললে আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যেই নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একটি উচ্চপর্যায় সূত্র নিশ্চিত করেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের অভ্যন্তরে প্রয়োজনীয় সকল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের পর যাতে কোনো বিলম্ব না হয়, সেজন্য প্রজ্ঞাপন জারির যাবতীয় প্রস্তুতি আগে থেকেই রাখা হয়েছে। ফলে এখন সরকারি চাকরিজীবীদের সমস্ত দৃষ্টি আগামী সোমবারের মন্ত্রিসভা বৈঠকের দিকে। এই প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটবে এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পথে এক বিশাল অগ্রগতি অর্জিত হবে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে খসড়া এবং প্রয়োজনীয় সকল নথিপত্র চূড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী সোমবারের মন্ত্রিসভার এজেন্ডায় নতুন বেতন কাঠামোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে এবং অনুমোদনের জন্য তা উপস্থাপন করা হবে। তবে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পেশ করা চূড়ান্ত খসড়ায় বেতন-ভাতা বৃদ্ধির প্রকৃত হার কত হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা।

এর আগে গত ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং খুব শীঘ্রই তা ঘোষণা করা হতে পারে। একইভাবে, ২৯ জুলাই অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, সরকারি কর্মচারীদের জন্য নবম বেতন কমিশন ঘোষণা নিয়ে কাজ চলছে এবং কাজ শেষ হওয়া মাত্রই তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারির কাজ শুরু হবে।

উল্লেখ্য, সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করার লক্ষ্যে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি ইতিমধ্যে তাদের বিস্তারিত সুপারিশ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো জানায়, সচিব কমিটি প্রথম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। এই বর্ধিত বেতন দুই ধাপে বাস্তবায়ন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে; যার মধ্যে প্রথম বছরে মূল বেতন এবং দ্বিতীয় বছরে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা কার্যকর হতে পারে।

তবে সতর্ক করা হয়েছে যে, নতুন পে-স্কেলে কার বেতন কত হবে তা চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তাই বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত গ্রেডভিত্তিক বেতনকে চূড়ান্ত হিসেবে না দেখে প্রস্তাবিত বা সম্ভাব্য কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০তম গ্রেডে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত মূল বেতনের সম্ভাব্য তালিকাটি নিম্নরূপ:
১ম গ্রেড: ১,৬০,০০০ টাকা (নির্ধারিত)
২য় গ্রেড: ১,৩২,০০০ - ১,৫৩,০০০ টাকা
৩য় গ্রেড: ১,১৩,০০০ - ১,৪৮,৮০০ টাকা
৪র্থ গ্রেড: ১,০০,০০০ - ১,৪২,৪০০ টাকা
৫ম গ্রেড: ৮৬,০০০ - ১,৩৯,৭০০ টাকা
৬ষ্ঠ গ্রেড: ৭১,০০০ - ১,৩৪,০০০ টাকা
৭ম গ্রেড: ৫৮,০০০ - ১,২৬,৮০০ টাকা
৮ম গ্রেড: ৪৭,২০০ - ১,১৩,৭০০ টাকা
৯ম গ্রেড: ৪৫,১০০ - ১,০৮,৮০০ টাকা
১০ম গ্রেড: ৩২,০০০ - ৭৭,৩০০ টাকা
১১তম গ্রেড: ২৫,০০০ - ৬০,৫০০ টাকা
১২তম গ্রেড: ২৪,৩০০ - ৫৮,৭০০ টাকা
১৩তম গ্রেড: ২৪,০০০ - ৫৮,০০০ টাকা
১৪তম গ্রেড: ২৩,৫০০ - ৫৬,৮০০ টাকা
১৫তম গ্রেড: ২২,৮০০ - ৫৫,২০০ টাকা
১৬তম গ্রেড: ২১,৯০০ - ৫২,৯০০ টাকা
১৭তম গ্রেড: ২১,৪০০ - ৫১,৯০০ টাকা
১৮তম গ্রেড: ২১,০০০ - ৫০,৯০০ টাকা
১৯তম গ্রেড: ২০,৫০০ - ৪৯,৬০০ টাকা
২০তম গ্রেড: ২০,০০০ - ৪৮,৪০০ টাকা

এই তালিকাটি পূর্ববর্তী কমিশন বা সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের প্রস্তাবিত কাঠামোর ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। সরকারি প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশের আগে এটিকে চূড়ান্ত বেতন কাঠামো হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

অন্যদিকে, সরকারের ১৮০ দিন উপলক্ষে গৃহীত কার্যক্রমের বিবরণ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক একটি ই-বুক প্রকাশ করেছে। ওই বইয়ের ‘নবম পে–স্কেল: সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় সুখবর’ শীর্ষক উপশিরোনামে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে জানানো হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বেতন-ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।