রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম আলোচনায় তুঙ্গে: বিএনপির মনোনয়ন ঘিরে তোলপাড়
দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবলভাবে আলোচিত হচ্ছে। যদিও দলটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি, তবে দলীয় নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এখন ঘুরেফিরে তাঁর নামই উচ্চারিত হচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আগামী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুলকেই চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিতে পারেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সব ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে দলীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে। দলীয় সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তারেক রহমানই চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবেন কে হবেন দলের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী।
নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত তফসিল অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে বিএনপি। এরই অংশ হিসেবে গতকাল প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের কার্যালয় থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে দলটি। বিএনপির জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই মনোনয়নপত্রগুলো সংগ্রহ করেন। তবে কার জন্য এই মনোনয়নপত্র কেনা হয়েছে, তা নিয়ে এখনো রহস্য বজায় রেখেছে দলটির নেতৃত্ব। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, একই ব্যক্তির নামে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার একটি প্রচলিত রীতি রয়েছে। মূলত একটি মনোনয়নপত্রে কোনো যান্ত্রিক ভুল বা ত্রুটি থাকলে যাতে অন্যটি বিবেচনায় নেওয়া যায়, সেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবেই এমনটি করা হয়। সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নির্বাচনের সময়েও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য ইতিমধ্যে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে চমক দিয়েছে। গতকাল রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১-দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকের পর বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জানান, জোটের অন্যতম শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির অভ্যন্তরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা কেন এত বেশি, তা নিয়ে আলোচনা করছেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাথে আলাপকালে কয়েকজন সিনিয়র নেতা জানান, দলের দীর্ঘদিনের মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুলের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে গত ১৭ বছরের চরম প্রতিকূল সময়ে বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং দলের সাংগঠনিক কাঠামো ধরে রাখতে তাঁর যে সক্রিয় ভূমিকা ছিল, তা সর্বস্তরে প্রশংসিত। তাঁর পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক ভাবমূর্তি, দলের প্রতি অবিচল আনুগত্য এবং সংকটকালীন সময়ে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁকে অন্য প্রার্থীদের চেয়ে এগিয়ে রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
যদিও আলোচনায় মির্জা ফখরুলের নাম সবচেয়ে বেশি, তবে তালিকায় আরও কয়েকজন অভিজ্ঞ নেতার নাম রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম, দলীয় জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ড. আবদুল মঈন খানের নামও আলোচনায় এসেছে। এই চারজনই বিএনপির পোড়খাওয়া নেতা হিসেবে দলের ভেতরে সমাদৃত। তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণে মির্জা ফখরুলের গ্রহণযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি। দলীয় প্রধান তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও রাজনৈতিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন তিনি, যা তাঁর মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনাকে আরও দৃঢ় করে।
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিতে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়ে শিক্ষা ও গবেষণায় অবদান রাখেন। এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং দ্রুত নেতৃত্বের সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠেন। ১৯৯২ সালে তিনি বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন এবং একই সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিরোধী দলের অন্যতম প্রধান মুখপাত্র হিসেবে গণমাধ্যমে তাঁর পরিচিতি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ২০১১ সালের ২০ মার্চ তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব অর্পণ করেন। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন। গত ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের কঠিন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে ১১১টি মামলা দায়ের করা হয় এবং ১১ বার তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আছে যে, হাসিনা সরকার দল ভাঙার উদ্দেশ্যে মির্জা ফখরুলকে বিভিন্ন সময় প্রলোভন এবং চাপের মুখে ফেলেছিল, কিন্তু তিনি তাঁর আদর্শ ও দলের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। তারেক রহমান লন্ডনে এবং বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে থাকা অবস্থায় দেশে দলের দৃশ্যমান নেতৃত্বের প্রধান মুখ হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। যদি একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন, তবে ২০ আগস্ট বেলা ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। যেহেতু বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তাই দলটির মনোনীত প্রার্থীই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া কার্যত নিশ্চিত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীই এই পদে জয়ী হন এবং বিরোধী দল প্রার্থী দেয় না, তবে এবার জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানকে যথাযথ মর্যাদায় সফলভাবে সম্পন্ন করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ইতিমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। এই উদ্দেশ্যে ছয়টি বিশেষ কমিটি গঠন করে গতকাল এক অফিস আদেশের মাধ্যমে তা জানানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ২০ আগস্ট ভোট গ্রহণের পর, প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে নির্ধারিত দিন ও সময়ে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হবে।
গঠিত কমিটিগুলোর মধ্যে রয়েছে—মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব সমন্বয় ও সংস্কার ফারাহ শাম্মীর নেতৃত্বে একটি সমন্বয় কমিটি। এছাড়া প্রশাসন ও বিধি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. শামীম সোহেলের নেতৃত্বে ডকুমেন্টেশন ও রেকর্ড সংরক্ষণ কমিটি এবং অতিথি তালিকা প্রণয়ন ও আমন্ত্রণপত্র মুদ্রণ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সমন্বয় অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ খালেদ হাসানের নেতৃত্বে আমন্ত্রণপত্র বিতরণ ও প্রাপ্তি যাচাই কমিটি এবং অর্থনৈতিক অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে আসন ব্যবস্থাপনা কমিটি কাজ করবে। সবশেষে, আইন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ইয়াসমিন বেগমের নেতৃত্বে একটি অভ্যর্থনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই ছয়টি কমিটির সমন্বিত প্রচেষ্টায় রাষ্ট্রপতি শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান সুচারুভাবে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, বিএনপির চূড়ান্ত মনোনয়ন কার ভাগ্য লিখে দেয় এবং দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে কে শপথ গ্রহণ করেন।











