চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আকস্মিক আগমনের খবরে যেন এক জাদুমন্ত্র কাজ করল। দীর্ঘদিনের পরিচিত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ মুহূর্তেই যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। গতকাল পর্যন্ত যে হাসপাতালের আঙিনায় তীব্র দুর্গন্ধে রোগীদের ও তাদের স্বজনদের টেকা দায় ছিল, রোববার (৯ আগস্ট) সেখানে দেখা গেল এক ঝকঝকে ও পরিচ্ছন্ন রূপ।
ঝাড়ু আর পানির বালতি হাতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের এমন অভাবনীয় দৌড়ঝাঁপ আগে কখনও দেখেননি সেখানে আসা সাধারণ মানুষ। মেঝে থেকে শুরু করে ওয়ার্ডের প্রতিটি কোণ এখন পরিচ্ছন্নতার ছোঁয়ায় উজ্জ্বল। শয্যায় শুয়ে থাকা রোগীরা এই আকস্মিক পরিবর্তনে রীতিমতো তাজ্জব হয়ে বলছেন, এমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হাসপাতালের কথা তারা স্বপ্নেও ভাবেননি। তবে স্বাস্থ্য প্রশাসনের এই হঠাৎ ‘চমক’ এবং অতি-তৎপরতা সাধারণ জনমনে এক গভীর প্রশ্ন জাগিয়েছে—যদি মন্ত্রীর আগমনের খবরে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো পরিবেশ চকচকে করা সম্ভব হয়, তবে সাধারণ রোগীরা এতদিন কেন চরম অবহেলা ও দুর্গন্ধে কষ্ট পেলেন?
জানা গেছে, রোববার সকালে কোনো প্রকার পূর্বঘোষণা ছাড়াই চাঁদপুর জেলায় আগমন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি প্রথমে হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে যান এবং সেখানে নানা ধরনের অনিয়ম ও অব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করেন। এই অবস্থায় ক্ষুব্ধ হয়ে মন্ত্রী তৎক্ষণাৎ চাঁদপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ নুর আলম দীনকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। যদিও এর কয়েক ঘণ্টা পর ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে সেই প্রত্যাহার আদেশ তুলে নেন মন্ত্রী, তবে এই ঘটনার খবরটি দ্রুত বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুরের সবকটি উপজেলায়।
মন্ত্রীর এমন কঠোর অবস্থানের কথা শুনেই ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শুরু হয় তড়িঘড়ি সাফাই অভিযান। যা রূপ নেয় যেন এক অলৌকিক পরিবর্তনে। হাসপাতালে চার দিন ধরে চিকিৎসাধীন রোগী সামছুদ্দিন বলেন, "আমি গত চার দিন ধরে এখানে ভর্তি আছি। হাসপাতালে আসার পর দেখেছি নাকে রুমাল দিয়ে থাকতে হয়, কারণ দুর্গন্ধ অসহ্য ছিল। কিন্তু আজ হঠাৎ করে সব অলৌকিকভাবে গায়েব হয়ে গেল, পুরো হাসপাতাল পরিষ্কার হয়ে গেল! আমরা তো সবসময় এমন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ আশা করি। হাসপাতাল যদি নিয়মিত এমন পরিষ্কার রাখা হতো, তবে রোগীদের রোগবালাই অর্ধেক এমনিতেই সেরে যেত।"
এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. আসাদুজ্জামান জুয়েল জানান, তাদের হাসপাতাল সব সময়ই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে আজ সকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয় চাঁদপুরে আসায় পরিচ্ছন্নতার মাত্রা আরও কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। পরিচ্ছন্নতার অভাবের পেছনে মূলত জনবল সংকটকে দায়ী করে তিনি আরও বলেন, "আমাদের এই হাসপাতালে প্রতিদিন প্রচুর সংখ্যক রোগী সেবা নিতে আসেন। যেখানে মানুষের যাতায়াত এত বেশি, সেখানে কিছুটা ময়লা হওয়া স্বাভাবিক। তাছাড়া আমাদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চরম সংকট রয়েছে—মাত্র দুজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে পুরো হাসপাতাল সামলাতে হয়। তাদের মধ্যে কেউ একজন ব্যস্ত থাকলে বা অনুপস্থিত থাকলে কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।" জনবল সংকট নিরসনে ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে এবং আশা করা হচ্ছে দ্রুতই এর সমাধান হবে।







