প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ৯ দফা দাবি পেশ করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। মহান আল্লাহ, রাসুল (সা.), পবিত্র কোরআন এবং ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে কঠোর আইনের বিধানসহ একগুচ্ছ দাবি সম্বলিত এই প্রস্তাবনাটি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। রবিবার বিকেলে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ঐতিহাসিক আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর মধ্যকার এক বিশেষ সাক্ষাতের সময় এই দাবিগুলো উত্থাপন করা হয়।

হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি অভিনন্দনপত্র প্রদান করা হয়, যার সাথে এই ৯ দফা দাবি সংযুক্ত ছিল। অভিনন্দনপত্রের ভাষায় বলা হয়, চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ির বাবুনগর পুণ্যভূমিটি বিপ্লব, ঐতিহ্য এবং আধ্যাত্মিক রাহবার ও উলামায়ে কেরামের স্মৃতিবিজড়িত এক ঐতিহাসিক জনপদ। এই পবিত্র ভূমিতে প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে স্বাগত জানিয়ে উলামায়ে কেরাম ও স্থানীয় জনগণের পক্ষ থেকে তাকে ‘প্রাণঢালা মহব্বত ও আন্তরিক মোবারকবাদ’ জানানো হয়। একইসাথে অভিনন্দনপত্রে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী, সাবেক আমির আল্লামা হাফেজ জুনায়েদ বাবুনগরী এবং ইসলাম ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে আত্মত্যাগী সকল শহীদদের।

অভিনন্দনপত্রে আরও উল্লেখ করা হয় যে, ফটিকছড়ি কেবল একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়, বরং এটি দেশের দ্বীনি শিক্ষা, ইসলামি সংস্কার এবং আধ্যাত্মিক সাধনার একটি ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বাবুনগর মাদ্রাসা এবং এর আশপাশের দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘকাল ধরে আলেম গঠন, বিশুদ্ধ আকিদা চর্চা এবং সমাজ সংস্কারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে শায়খুল হাদিস আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী এবং বর্তমান আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর মতো প্রবীণ ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে এই অঞ্চলটি সমকালীন ইসলামি বিশ্বের অন্যতম প্রধান মারকাজ হিসেবে স্বীকৃত। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে এই অঞ্চলের ইতিহাস ও রাজনৈতিক পরিক্রমায় এক নতুন ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করে অভিনন্দনপত্রে বলা হয়, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক জুলাই বিপ্লব, ২০১৩ সালের ‘নাস্তিক্যবাদবিরোধী লড়াই’, বাঙালি মুসলিম সমাজের ধর্মীয় চেতনা রক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিটি সংগ্রামে আলেম সমাজের ভূমিকা ছিল সুদৃঢ় ও অবিচল। এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান স্মরণ করে বলা হয়, তিনি সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযোজন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলার ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করে জাতীয় রাজনৈতিক ধারায় ইসলামি মূল্যবোধকে যথাযথ সম্মানের স্থানে বসিয়েছিলেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী (প্রয়াত) বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা হয়, তিনি এদেশের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ এবং দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সর্বদা গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিক সমমর্মিতা প্রদর্শন করেছেন। বিশেষ করে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ঐতিহাসিক গণআন্দোলনের প্রতি বেগম খালেদা জিয়ার সমর্থন ও সহমর্মিতার কথা আলেম সমাজ গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের পেশ করা ৯ দফা দাবিগুলো হলো:
১. মহান আল্লাহ, রাসুল (সা.), পবিত্র কোরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে জাতীয় সংসদে দ্রুত আইন পাস করা।
২. পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন পাস না করা।
৩. ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত গণহত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা। এছাড়া ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের নারকীয় হত্যাযজ্ঞে জড়িত সকল খুনি ও হুকুমের আসামিদের বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রকৃত ন্যায়বিচার কায়েম করা।
৪. কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রিকে মাস্টার্সের সমমানের স্বীকৃতি কার্যকর করা, যাতে কওমি শিক্ষার্থীদের জন্য দেশ-বিদেশের সর্বত্র উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে ধর্মীয় শিক্ষকের পদের জন্য সরকারি মাদ্রাসার ডিগ্রির পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) ডিগ্রিকে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে উল্লেখ করা।
৫. প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সকল মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
৬. কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা করা এবং হিজবুত তাওহিদ নামক সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করা।
৭. পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশি-বিদেশি মিশনারিগুলোর ষড়যন্ত্র এবং অপতৎপরতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
৮. আওয়ামী সরকারের আমলে আলেমদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় এদেশের আলেম-ওলামাদের অংশীদার করা।
৯. বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম এবং টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা যেন উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় তা নিশ্চিত করা। এছাড়া ভারতের বিতর্কিত মাওলানা সাদের বাংলাদেশে আগমনে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা এবং টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থীদের ইজতেমার অনুমতি না দেওয়া।

অভিনন্দনপত্রের শেষ অংশে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর এই ফটিকছড়ি সফর কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়, বরং এটি দ্বীন ও রাষ্ট্রের মেলবন্ধনের এক অনন্য স্মারক। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং আলেম সমাজের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ দেশের তৌহিদী জনতাকে ঐক্যবদ্ধ হতে অনুপ্রাণিত করবে। প্রধানমন্ত্রীর সফর সফল, ফলপ্রসূ ও নিরাপদ হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা হয়। একইসঙ্গে তার নেক হায়াত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তৌফিক কামনা করে বলা হয়, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি স্বাবলম্বী, ন্যায়ভিত্তিক এবং নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠুক।

উক্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল, স্থানীয় সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর এবং হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান।