শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের লড়াই এবং বলিউড তারকাদের নীরবতা নিয়ে শুরু হওয়া এক বিতর্ক এখন তুঙ্গে। বর্ষীয়ান অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছে ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গন এবং রাজনৈতিক মহল। সম্প্রতি একটি শিক্ষার্থী আন্দোলনে যোগ দিয়ে অভিনেতার ওই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন বিশিষ্ট অভিনেতা ও সংগীতশিল্পী পিয়ূষ মিশ্র। আর এই বিতর্কে পিয়ূষের পাশে দাঁড়িয়ে প্রবীণ অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহকে সরাসরি নিশানা করেছেন বিজেপি সাংসদ ও বলিউড অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাওয়াত। নাসিরুদ্দিন শাহকে এক চতুর ‘শিয়াল’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে কঙ্গনা খোঁচা দিয়ে বলেন, এই অভিনেতা ভারতের অন্ন গ্রহণ করলেও লড়াই করেন মূলত প্রতিবেশী দেশের স্বার্থে।

ঘটনার সূত্রপাত মূলত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) প্রতিবাদ এবং দিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলাকালীন। সে সময় মুম্বাই চলচ্চিত্র শিল্পের নীরব ভূমিকা নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করেছিলেন নাসিরুদ্দিন শাহ। তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, বলিউড ইন্ডাস্ট্রি এখন এমন এক কুকুরের মতো হয়ে গেছে যার মুখে হাড় গোঁজা রয়েছে, যার ফলে সে আর ঘেউ ঘেউ করতে বা ডাকতে পারছে না। তার এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, বড় তারকাদের আর্থিক সুবিধা এবং ক্ষমতার মোহ তাদের সত্য কথা বলতে বাধা দিচ্ছে।

দীর্ঘদিন পর সম্প্রতি ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামে আয়োজিত শিক্ষার্থীদের এক বিক্ষোভ কর্মসূচিতে উপস্থিত হন পিয়ূষ মিশ্র। সেখানে লাঠিচার্জের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এবং নাসিরুদ্দিন শাহর পুরনো মন্তব্যের জের টেনে কড়া জবাব দেন তিনি। রাঁচির সেই প্রতিবাদ মঞ্চ থেকে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে পিয়ূষ মিশ্র সরাসরি প্রশ্ন তোলেন প্রবীণ অভিনেতার নিজের অবস্থান নিয়ে। তিনি বলেন, “নাসির সাহেব, যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের সময় চলচ্চিত্রশিল্পের লোকজনের নীরবতা নিয়ে আপনি বলেছিলেন যাদের মুখে হাড় আছে তারা কথা বলে না। যথেষ্ট সম্মান রেখেই আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, আজ ঝাড়খণ্ডের শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের সময় বাকি যে কুকুররা কথা বলতে পারে না, তারা এখন কোথায়?”

একই সঙ্গে নিট (NEET) প্রশ্নফাঁস নিয়ে দিল্লি ও মুম্বাইয়ের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া একশ্রেণির মানুষের সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন, তারা অধিকারের জন্য লড়াই করা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে পিৎজা ও বার্গার খেয়ে আরাম-আয়েশ করতেই বেশি আগ্রহী। পিয়ূষ অবশ্য স্পষ্ট করে দেন যে, একজন অভিনেতা হিসেবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নাসিরুদ্দিন শাহকে শ্রদ্ধা করেন, তবে এখন আর তাকে দেখে ভয় পান না বা দমে যান না।

পিয়ূষ মিশ্রর এই সাহসী বক্তব্যে সমর্থন জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একহাত নেন কঙ্গনা রানাওয়াত। তিনি তার পোস্টে লিখেছেন, সত্য এটাই যে সবাই কারও না কারও কুকুর। তবে তিনি যে দেশের অন্ন গ্রহণ করেন, তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে এবং দেশের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য লড়াই করতে পেরে তিনি গর্বিত। কঙ্গনা আরও লেখেন, নাসির সাহেব এই দেশের অন্ন ঠিকই খান, কিন্তু লড়াই করেন প্রতিবেশী দেশের হয়ে। আনুগত্যের দিক থেকে কুকুরের সঙ্গে তুলনা করাকে একধরনের প্রশংসনীয় বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে তিনি আরও যোগ করেন, নাসিরুদ্দিন শাহর মতো চতুর ‘শিয়াল’ হওয়ার চেয়ে তিনি বরং বিশ্বস্ত কুকুর হওয়াকেই বেছে নেবেন।

চলচ্চিত্র তারকা এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের এই সরাসরি পাল্টাপাল্টি আক্রমণে সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে তারকাদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে পিয়ূষ ও নাসিরুদ্দিনের শিল্পভিত্তিক মতভেদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের সাংসদ কঙ্গনা রানাওয়াত যুক্ত হওয়ায় পুরো বিতর্কটি এখন একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক মাত্রা লাভ করেছে। উল্লেখ্য, বিতর্কিত মন্তব্য করা যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে কঙ্গনার। এর আগে নিট প্রশ্নফাঁস নিয়ে তরুণসমাজের আন্দোলন নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে ব্যাপক সমালোচিত হন তিনি। তৎকালীন সময়ে ‘জেন-জি’ (Gen-Z) প্রজন্মকে ‘নর্দমার প্রজন্ম’ বলে তীব্র তোপের মুখে পড়েন এই অভিনেত্রী। তবে পরে নিজের অবস্থান থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে এসে তাদের ‘দেশের সেরা সম্পদ’ বলে আখ্যা দেন। এবার বর্ষীয়ান অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহকে নিয়ে তার এহেন মন্তব্য নিশ্চয়ই ভালো চোখে দেখছেন না চলচ্চিত্রপ্রেমী এবং বোদ্ধামহল।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া