সিলেটে বৃদ্ধ দম্পতি ও গৃহকর্মীকে গলা কেটে হত্যা: লোডশেডিংয়ের সুযোগ নিয়ে পরিকল্পিত অপরাধের সন্দেহ

সিলেট নগরের রায়নগর এলাকার একটি অভিজাত বাসায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার সকালে মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দো-তলা থেকে এক বৃদ্ধ দম্পতি এবং তাদের গৃহকর্মীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের ধারণা, পরিকল্পিতভাবে এবং লোডশেডিংয়ের সুযোগ নিয়ে এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি পরিকল্পিত ডাকাতি, পারিবারিক বিরোধ নাকি পূর্বশত্রুতার জেরে ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নিহতরা হলেন মো. আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) এবং নগরের জল্লারপাড় এলাকার বাসিন্দা কিশোরী গৃহকর্মী তাহমিনা (১৫)। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বাসার ভেতরে দুটি আলাদা কক্ষে মরদেহগুলো পাওয়া যায়। একটি কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয় সুরাইয়া বেগম ও তাহমিনার মরদেহ, আর অপর একটি কক্ষ থেকে পাওয়া যায় আব্দুস সাত্তারের মরদেহ।

ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, সকালে প্রতিবেশীরা বাসার দরজার নিচ দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে সন্দেহ করেন এবং দ্রুত পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ এসে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলে তিনজনের রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পায়। বাসার ভাড়াটেদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, সকালে বাসার ভেতর থেকে তীব্র চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শোনা গিয়েছিল, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে যে হত্যাকাণ্ডটি ওই সময়েই ঘটেছে।

পুলিশ কমিশনার জানান, তিনজনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, যদিও ঘটনাস্থল থেকে কোনো অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। তদন্তে দেখা গেছে, বাসার ওয়ারড্রব ও আলমারিগুলো খোলা অবস্থায় ছিল। স্বর্ণালংকারসহ অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র খোয়া গেছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। ডাকাতির সঙ্গে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি পারিবারিক বিরোধ বা পূর্বশত্রুতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই তদন্তে বাসায় পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিলকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করছে পুলিশ।

ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে পুলিশের একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি পিবিআই (PBI), সিআইডি (CID) এবং অন্যান্য বিশেষায়িত দল যৌথভাবে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বুধবার সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ওই এলাকায় লোডশেডিং ছিল। পুরো মিতালী আবাসিক এলাকা এবং ওই নির্দিষ্ট বাসাটি সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকলেও, বিদ্যুৎ না থাকায় ওই নির্দিষ্ট সময়ের কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তদন্তকারীদের ধারণা, সিসি ক্যামেরার অবস্থান এবং লোডশেডিংয়ের সময়টি আগে থেকেই জেনে নিয়ে অপরাধীরা এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়েছে।

নিরাপত্তাকর্মীদের ভাষ্যমতে, ওই বাসায় দুজন গৃহকর্মী কর্মরত ছিলেন। নিহত তাহমিনা ছাড়াও অপর একজন গৃহকর্মী বর্তমানে নিখোঁজ রয়েছেন, যার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এছাড়া বাসার গাড়িচালকের সূত্রে জানা গেছে, নিচতলার এক ভাড়াটের সঙ্গে বাড়ির মালিকের দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছিল। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা সেই বিরোধের পর গত মাসে ওই ভাড়াটে বাসা ছেড়ে চলে যান। এই বিরোধের সঙ্গে বর্তমান হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। উল্লেখ্য, নিহত দম্পতির চার সন্তান রয়েছেন, যাদের মধ্যে দুজন লন্ডনে এবং দুজন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন।

সিলেট কোতোয়ালি থানার ওসি খান মোহাম্মদ মইনুল জাকির বলেন, “ঘটনাটি ডাকাতি, পারিবারিক শত্রুতা নাকি পূর্ববিরোধের জেরে ঘটেছে, সব বিষয় সামনে রেখে আমরা তদন্ত করছি। ক্রাইম সিন সংরক্ষণ করে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিভিন্ন তথ্যের সহায়তায় দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।”

১২০টি সিসি ক্যামেরার চোখ থাকলেও লোডশেডিংয়ে অকেজো পুরো এলাকা

সিলেট নগরের রায়নগর এলাকার মিতালি আবাসিক এলাকাটি অত্যন্ত সুরক্ষিত হিসেবে পরিচিত। এখানে নিরাপত্তাকর্মীদের পাশাপাশি প্রতিটি গলি ও মূল সড়কে মোট ১২০টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসি ক্যামেরা) বসানো রয়েছে। এমনকি এলাকার সাধারণ ক্যামেরার পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি বাসাবাড়িতেই আলাদা নিরাপত্তা ক্যামেরা রয়েছে। তবে এই হত্যাকাণ্ডের সময় লোডশেডিং থাকার কারণে অধিকাংশ ক্যামেরাই অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। ফলে খুনিদের যাতায়াতের কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি, যা পুলিশের তদন্তের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক ধারণায় মনে করা হচ্ছে এই হত্যাকাণ্ডটি একজন ব্যক্তির দ্বারাই সংঘটিত হয়েছে। বাসার ভেতরের অধিকাংশ ক্যামেরায় আইপিএস সংযোগ না থাকলেও, একটি ক্যামেরায় সংযোগ ছিল। সেই ক্যামেরার সীমিত ফুটেজ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে, যার আলোকেই পুলিশ এখন তদন্তের আগুচ্ছে। মিতালি আবাসিক এলাকার বাসিন্দা একরাম হোসেন বলেন, “আমাদের কাছে মনে হচ্ছে এটি অত্যন্ত পরিকল্পিত একটি অপরাধ। এই ঘটনার পর আমরা এলাকাবাসী চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমরা দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানাই।”

সংসারে স্বস্তির আগেই নির্মম মৃত্যুর শিকার তাহমিনা

যে বাসায় এই করুণ ঘটনাটি ঘটেছে, সেখানে গত কোরবানির ঈদের পরপরই কাজ শুরু করেছিলেন ১৫ বছর বয়সী গৃহকর্মী তাহমিনা। দিনমজুর বাবার অভাবের সংসারে একটু স্বস্তি আনতে এবং পরিবারের পাশে দাঁড়াতে এই কিশোরীটি কাজে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু সংসারের কষ্ট দূর করার আগেই তাকে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হলো। বুধবার সকালে বৃদ্ধার মরদেহের পাশেই পড়ে থাকতে দেখা যায় তাহমিনাকে। তার বুকে ও গলায় ধারালো অস্ত্রের গভীর আঘাত পাওয়া গেছে।

তাহমিনার বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দোয়ারাবাজার এলাকায়। তার বাবা আপ্তাব মিয়া পেশায় একজন দিনমজুর। পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কোরবানির ঈদের পর তাহমিনা রায়নগরের ওই বাসায় কাজের মেয়ে হিসেবে আসে এবং সিলেট শহরের জল্লারপাড় এলাকার বাচ্চু মিয়ার কলোনিতে পরিবারের সাথে থাকত। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল সবার বড়। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় খুব অল্প বয়সেই তাকে সংসারের হাল ধরতে কাজ শুরু করতে হয়েছিল।

তাহমিনার মামা রাহিম মিয়া অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, “কোরবানির ঈদের পর তাহমিনা ওই বাসায় কাজে গিয়েছিল। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল, তাই সে কাজ করে আমাদের সহযোগিতা করত।”

সকালে তাহমিনার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তার স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। বাবা-মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। আদরের বড় মেয়েকে এভাবে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তারা। মেয়ের এমন অমানুষিক মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না শোকসন্তপ্ত পরিবার।