শাহাবুদ্দিন আহামেদ

বেনাপোলে তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত: ব্যবসায়ীদের চরম ভোগান্তি

বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে পরিচিত বেনাপোল পৌর এলাকায় ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছেন সাধারণ নাগরিক এবং ব্যবসায়ী সমাজ। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের এই তীব্রতায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। সরকারি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এক ঘণ্টা পর পর বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা থাকলেও, বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ আসার পর তা মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের বেশি স্থায়ী হচ্ছে না। এই অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পাশাপাশি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কারিগরি পেশার সাথে জড়িত মানুষগুলো।

গত কয়েকদিন ধরে বেনাপোলে বিদ্যুতের এই ঘন ঘন আসা-যাওয়ার ঘটনায় চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যুতের এই অনিশ্চিত অবস্থার কারণে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা হ্রাস পাচ্ছে এবং দোকানপাটের দৈনন্দিন ব্যবসায়িক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে যারা বিদ্যুৎনির্ভর পেশায় নিয়োজিত, তারা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।

এই সংকটের বিষয়ে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট ২০২৬) রাতে বেনাপোল সাব-জোনাল অফিসের নতুন সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম-ওএন্ডএম) মো. মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বেনাপোলে এক ঘণ্টা পর পর বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা এবং বর্তমানে সারা বাংলাদেশেই লোডশেডিং চলছে। তবে এক ঘণ্টা পর পর বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা থাকলেও কেন বাস্তবে তা মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিট স্থায়ী হচ্ছে—এমন যৌক্তিক প্রশ্নের জবাবে তার উত্তর ছিল হতাশাজনক। তিনি বলেন, “এ ব্যাপারে আমরাও কথা বলছি। আপনারাও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন—বেনাপোলে বিদ্যুৎ থাকছে না কেন।”

লোডশেডিংয়ের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তার বিশেষ নির্দেশ আছে কি না জানতে চাওয়া হলে এজিএম আরও জানান, “কেউ নির্দেশ দেননি। গ্রিড থেকে যখন বলা হয়, তখনই আমরা লোডশেডিং করি। আমরা নিজেরা কিছু করি না। আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করি না; গ্রিড থেকে যা পাই, তা আপনাদের দিয়ে দিই।” তার এই বক্তব্যে স্থানীয়দের মধ্যে আরও অসন্তোষ ছড়িয়েছে।

এই ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কারিগরি পেশার মানুষ। বেনাপোলের রবিন সরকার সেলুনের নাপিত তার কষ্টের কথা জানাতে বলেন, “বেশ কয়েকদিন ধরে আমরা তীব্র লোডশেডিংয়ের সমস্যায় ভুগছি। আমরা যে সামান্য বিদ্যুৎ পাচ্ছি, তা একজন খরিদ্দারের চুল কাটা শেষ হওয়ার আগেই চলে যাচ্ছে। এতে আমাদের কাজের গতি নষ্ট হচ্ছে এবং সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি।” একইভাবে টেলিভিশন মিস্ত্রি রফিক অভিযোগ করেন, “দুই-তিন দিন ধরে একটি এলইডি টেলিভিশন মেরামতের কাজ করছি, কিন্তু বিদ্যুতের এই খামখেয়ালি অবস্থার কারণে কাজটি এখনো শেষ করতে পারিনি। এভাবে চলতে থাকলে আমরা চরম বিপদে পড়ে যাব।”

রফিক আরও একটি গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তিনি দাবি করেন, বেনাপোলের অনেক বিদ্যুৎ কর্মকর্তা দুর্গাপুর এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন এবং সেখানে বিদ্যুতের সরবরাহ সবসময় স্থিতিশীল থাকে। এই বৈষম্য স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দরনগরী বেনাপোলে দীর্ঘমেয়াদে এমন বিদ্যুৎ সংকট চলতে থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও প্রকট হবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা। তারা দ্রুত লোডশেডিংয়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং নিরবচ্ছিন্ন ও সহনীয় মাত্রায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন। তবে বিদ্যুৎ কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহের ওপর নির্ভর করেই স্থানীয়ভাবে লোডশেডিং পরিচালিত হচ্ছে। ফলে বেনাপোলবাসীর এই দীর্ঘ দুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।