নীলফামারীর শান্ত সবুজ প্রকৃতি আর তিস্তা নদীর স্নিগ্ধতা একসময় এই অঞ্চলের মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। এক প্রশান্তির পরিবেশের মাঝে গড়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের জীবন। কিন্তু সেই শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। প্রায় দুই দশক ধরে এই জনপদ প্রত্যক্ষ করেছে চরম অস্থিরতা আর ভাঙচুরের তাণ্ডব, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতা এবং তৎকালীন সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর, যাকে স্থানীয়রা ‘কসাই’ বলে অভিহিত করেন। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, ১৯৯৬ সাল থেকে জেলা রাজনীতিতে সক্রিয় এই নেতা অসহিষ্ণুতা এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতির মাধ্যমে পুরো এলাকাকে এক অশান্ত রণক্ষেত্রে পরিণত করেছিলেন।

নীলফামারী-২ (সদর) আসনের এমপি হিসেবে ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আসাদুজ্জামান নূরের সময়কালকে স্থানীয় বাসিন্দারা আজও মনে করেন এক ‘ভয়ঙ্কর যুগ’ হিসেবে। সেই সময়ে শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষই নয়, সাধারণ মানুষও চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগত। রাতের আঁধারে নিজের ঘরে নিরাপদে ঘুমানোর সাহস হারিয়েছিল মানুষ। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, অনেক এলাকায় মসজিদের নামাজ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই দুঃশাসনের এক নির্মম অধ্যায় শুরু হয় ২০০৬ সালে, যখন জলঢাকার পূর্ব বালাগ্রামে আওয়ামী লীগের তথাকথিত ‘লগি-বৈঠা’ তাণ্ডব শুরু হয়। সেই সহিংসতায় সাদের হোসেন নামে এক জামায়াত কর্মী নির্মমভাবে হত্যা করা হন। এরপর শুরু হয় ব্যাপক পুলিশি অভিযান, যার আড়ালে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের শতাধিক নেতাকর্মীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষও নির্যাতনের শিকার হন।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাড়ে ১৫ বছরের এই শাসনকালে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এক চরম রূপ ফুটে উঠেছে। জামায়াত নেতাকর্মীদের নামে দায়ের করা হয়েছে মোট ১৩২টি মামলা, যেখানে আসামি করা হয় ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষকে। একইভাবে বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে করা হয়েছে ৪৮টি মামলা, যাতে আসামি করা হয় ৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে। শুধু মামলা নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের দলীয় কার্যালয়গুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং অনেক অফিস পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়।

২০১৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর নীলফামারীর সদর উপজেলার লক্ষীচাপ ইউনিয়নে এক ভয়াবহ স্মৃতি রচিত হয়। তৎকালীন এমপি আসাদুজ্জামান নূরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের এক বিশাল গাড়িবহর নিয়ে সেখানে মহড়া দেওয়া হয়। বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের বাড়ি অতিক্রম করার সময় পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়। স্থানীয়রা এর প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ১৪১ রাউন্ড শটগান ও ৩৭ রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পাঁচজন প্রাণ হারান এবং আহত হন অর্ধশতাধিক মানুষ। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তৎকালীন প্রশাসন ও পুলিশের উপস্থিতিতেই আওয়ামী কর্মীরা নির্বিঘ্নে ভাঙচুর ও লুটপাটের কাজ চালিয়ে যান।

সহিংসতার ঢেউ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে রামগঞ্জ বাজারে। রাতে জেলা শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির ও মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান মন্টুর দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান—একটি মোটরসাইকেল শো-রুম এবং একটি ওষুধের দোকান—ভয়াবহভাবে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। রামগঞ্জ বাজারের এই সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। একটি মামলায় তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা বাবুল আকতার বাদী হয়ে ১৪ জন নামোল্লেখসহ প্রায় দেড় হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করেন। অন্য মামলায় নিহত কৃষক লীগ নেতা খোরশেদ আলম চৌধুরীর আত্মীয় রাশেদ চৌধুরী বাদী হয়ে ৮৬ জন নামোল্লেখসহ আরও দেড় হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করেন। দুটি মামলারই লক্ষ্য ছিল বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা। অভিযোগ উঠেছে, এসব মামলাকে পুঁজি করে পুলিশ গ্রেফতার অভিযানের নামে রীতিমতো ‘বাণিজ্য’ শুরু করে, যার মাধ্যমে লাখে লাখে অর্থ আদায় করা হতো।

ফলে পুরো এলাকা এক নিস্তব্ধ আতঙ্কে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। রামগঞ্জ, জলঢাকা, টুপামারী ও লক্ষীচাপসহ নীলফামারীর বিভিন্ন এলাকায় রাত মানেই ছিল চরম আতঙ্ক। মসজিদ, মাদ্রাসা, বাজার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় অচল হয়ে পড়ে। জীবন বাঁচাতে অনেক পরিবার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। পুলিশি অভিযানের নামে শিক্ষক, ব্যবসায়ী এবং সাংবাদিকরাও হয়রানির শিকার হন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে জামায়াত ও বিএনপির আটজন চাকরিজীবী তাদের পেশা থেকে বরখাস্ত হন। তৎকালীন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি মোজ্জাফর হোসেন এবং তার ছেলে এনটিভির জেলা প্রতিনিধি ইয়াসিন মোহম্মাদ সিথুনসহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের নামে মামলা দেওয়া হয় এবং তাদের কারাবন্দি করা হয়।

এই অন্ধকার সময়ের সবচেয়ে করুণ দিকটি ছিল রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। এজাহারে নাম থাকা তিন নেতাকর্মী পরবর্তী সময়ে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন। সদর উপজেলার লক্ষীচাপ ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী, ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আতিকুল ইসলাম এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি বিভাগের ছাত্র ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিনোদপুর থানা শাখার সভাপতি মহিদুল ইসলামকে অকালে প্রাণ হারাতে হয়। গোলাম রব্বানীর স্ত্রী শাহানাজ বেগম চোখের জল ফেলে বলেন, ‘তাকে আত্মীয়ের বাসা থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়। আজও আমরা বিচারের অপেক্ষায় আছি।’ আতিকুলের বড় ভাই আবদুল ওয়াদুদ জানান, ঘটনার পর আতিক আত্মগোপনে ছিল, কিন্তু ১৩ জানুয়ারি রাতে ডিবি পুলিশের পরিচয়ে তাকে টাঙ্গাইল থেকে তুলে নেওয়া হয় এবং দু-তিন দিন পর তার লাশ পাওয়া যায়। নিখোঁজ মহিদুলের ভাই শহিদুল জানান, মহিদুলের লাশ ১ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার শিবগঞ্জে অজ্ঞাত হিসেবে দাফন করা হয়, যা পরে ছবি দেখে শনাক্ত করা হয়।

জেলা জামায়াতের আমির ও নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘নূর ও তার অনুসারীরা জামায়াতের মেরুদণ্ড ভাঙতে চেয়েছিল। কিন্তু আমাদের নেতাকর্মীরা শেষ পর্যন্ত টিকে ছিলেন, আর আজ যারা নিপীড়ন করেছে তারাই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।’ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মীর সেলিম ফারুক বলেন, ‘সেই সময়ে রাজনীতির সমস্ত মূল্যবোধ ধ্বংস করা হয়েছে। ঘর, হাসপাতাল বা চাকরি—কোনো কিছুই নিরাপদ ছিল না।’

জানা যায়, সেই ভয়াবহ সময়ে রামগঞ্জ, টুপামারী ও লক্ষীচাপ বাজার টানা ছয় মাসের বেশি সময় ফাঁকা ছিল। মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা হয়ে গিয়েছিল হাতে গোনা। রামগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক ও আব্দুল ওহাব স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘রাতের আঁধারে আওয়ামী ক্যাডাররা দোকানের তালা ভেঙে সব পণ্য লুট করে নিয়ে গেছে। আমরা পুলিশের সহায়তা চেয়েছিলাম, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।’

নীলফামারীর শান্ত সবুজ ভূদৃশ্য আজও অপরূপ, কিন্তু সেই সময়ের আতঙ্ক, হত্যা আর নিপীড়নের দাগ এখানকার মানুষের মনে আজও অম্লান। ‘কসাই নূর’ এর সেই দুঃশাসন কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োগ ছিল না, বরং তা ছিল সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর এক দীর্ঘ অন্ধকার ছায়া, যা নীলফামারীর ইতিহাসে এক গভীর কালিমা ছড়িয়ে দিয়ে গেছে।