বলিউড অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাউত এবং বিতর্ক—এই দুই যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। চারবারের জাতীয় পুরস্কার জয়ী এই অভিনেত্রীর জীবন যেন বিতর্কের চারপাশেই আবর্তিত হয়। অভিনয় ক্যারিয়ার থেকে শুরু করে রাজনীতিতে প্রবেশ এবং পরবর্তীতে সংসদ সদস্য হয়ে ওঠা পর্যন্ত তার এই বিতর্ক সৃষ্টির সহজাত প্রবণতা বিন্দুমাত্র পরিবর্তিত হয়নি। সম্প্রতি ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে অশালীন শব্দ ব্যবহারের তীব্র সমালোচনা করে কঙ্গনা বর্তমান প্রজন্মের অর্থাৎ ‘জেন-জি’দের ‘জেনারেশন গাটার’ বা ‘নর্দমার প্রজন্ম‘ বলে অভিহিত করেন। কঙ্গনার এই মন্তব্যের পাল্টা জবাব দেয় সিজেপি, আর সেখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন সংঘাত। এই বিতর্কের ডালপালা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তা টেনে আনে হৃত্বিক রোশনের সঙ্গে কঙ্গনার দীর্ঘ ১০ বছরের পুরোনো আইনি তিক্ততাকেও।
তবে কঙ্গনা ও সিজেপির এই সাম্প্রতিক দ্বন্দ্বে হৃত্বিক রোশনকে টেনে আনার মূল কারিগর হলেন সিজেপি মুখপাত্র সৌরভ দাস। কঙ্গনার কড়া মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সৌরভ এক প্রকার রসিকতা করে বলেন, তার বন্ধুরা তাকে প্রায়ই তরুণ বয়সের হৃত্বিক রোশনের মতো দেখতে বলে। সম্ভবত এই চেহারার সাদৃশ্যই কঙ্গনাকে তার প্রতি আক্রমণাত্মক হতে উৎসাহিত করেছে। সৌরভের এই রসিকতাটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়তেই বহু বছর আগে স্তিমিত হয়ে আসা কঙ্গনা-হৃত্বিক বিতর্ক আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই কঙ্গনার সঙ্গে হৃত্বিকের অতীত সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দিয়ে হৃত্বিকের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করতে শুরু করেন।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে লেখক ফ্রেডি বার্ডির একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্ট যেন আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। কঙ্গনার মতো একজন বিতর্কপ্রিয় মানুষের সঙ্গে হৃত্বিকের সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়ে ফ্রেডি সরাসরি লেখেন যে, হৃত্বিক রোশনের উচিত বিশ্বের কাছে ক্ষমা চাওয়া। তবে এই পুরো টানাপোড়েন থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন হৃত্বিক। অত্যন্ত সংযত ও পরিশীলিত ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি লেখেন, "আমার বন্ধু, আপনি 'বি'-কে আর পছন্দ করেন না বলেই 'এ'-এর পক্ষ নিচ্ছেন। এটি আমাদের সমাজে জেঁকে বসা একটি বড় পদ্ধতিগত সমস্যার ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। আমি অপেক্ষা করব, যখন এর পেছনের প্রেক্ষাপটটি সঠিক হবে এবং যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অনুপ্রাণিত হবে। সেটাই হবে ন্যায্য। কিন্তু আবারও বলছি, এখন আর কারই বা কী যায় আসে, তাই না?"
হৃত্বিকের এই কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়াটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। ফলে তিনি বিতর্ক থেকে দূরে থাকতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। হৃত্বিকের এই বার্তার পর কঙ্গনা তার ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে খবরের একটি প্রতিবেদন শেয়ার করে অত্যন্ত কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানান। সেখানে তিনি হৃত্বিক রোশন ও সাবা আজাদের সম্পর্কের প্রতি শুভকামনা জানিয়ে লেখেন, "প্রিয় হৃত্বিক, আমি আনন্দিত যে তুমি তোমার মনের মতো সঙ্গী সাবা আজাদকে খুঁজে পেয়েছো এবং তোমাদের দুজনকে একসঙ্গে খুব সুন্দর মানায়। তুমি এখন একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সম্পর্কের মধ্যে আছো। তাই এভাবে একজন নারীকে উত্ত্যক্ত করা বা খোঁচা দেওয়া তোমাকে মানায় না। এর চেয়ে বরং তোমার উচিত সেইসব মানুষদের নিন্দা করা, যারা তোমার নাম ব্যবহার করে আমাকে হেনস্তা ও বুলিং করছে। আগুনে ঘি ঢালা বন্ধ করো এবং তোমার সঙ্গীকে অস্বস্তিতে ফেলা বন্ধ করো। আশা করি তোমার শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং তুমি এমন অযৌক্তিক মন্তব্য করা বন্ধ করবে।"
কঙ্গনা ও হৃত্বিকের এই চলমান দ্বন্দ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় অসংখ্য মিম তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে অভিযোগ ওঠে যে, হৃত্বিক নিজেই একটি মিমে লাইক দিয়েছেন, যা বিতর্কের আগুনে আরও জ্বালানি জোগায়। একজন রেডডিট ব্যবহারকারী একটি স্ক্রিনশট শেয়ার করেন, যেখানে দেখা যায় হৃত্বিকের ভেরিফায়েড ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে একটি পোস্টে লাইক দেওয়া হয়েছে। ওই পোস্টে লেখা ছিল, "হৃত্বিক ভাই, আপনি দলের স্বার্থে একটু ত্যাগ স্বীকার করতে পারতেন। কেন একে (কঙ্গনা) দেশের ওপর এভাবে খোলা ছেড়ে দিলেন?" তবে পরবর্তীতে মূল ইনস্টাগ্রাম পোস্টটি মুছে ফেলা হয় এবং ওই কথিত লাইকটিও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
কঙ্গনা ও হৃত্বিকের মধ্যকার তিক্ততার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ এবং জটিল। একসময় তাদের মধ্যে অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিল বলে জানা যায়। ২০১০ সালের 'কাইট্স' এবং ২০১৩ সালের 'কৃষ ৩' সিনেমায় একসঙ্গে কাজ করার সময় থেকেই তাদের প্রেমের গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। তবে ২০১৬ সালে একটি সাক্ষাৎকারে কঙ্গনা হৃত্বিককে তার 'সিলি এক্স' বা 'বোকা প্রাক্তন' হিসেবে অভিহিত করার পর এই গুঞ্জনটি প্রকাশ্যে আসে। কঙ্গনার দাবি ছিল, হৃত্বিক যখন সুজান খানের সঙ্গে বিবাহিত ছিলেন, তখন তাদের মধ্যে প্রায় সাত বছরের একটি গভীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং হৃত্বিক প্যারিসে তাকে বিয়ের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, হৃত্বিক শুরু থেকেই এই দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন এবং স্পষ্টভাবে জানান যে, তাদের মধ্যে পেশাগত সম্পর্ক ছাড়া ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক কখনোই ছিল না। ২০১৬ সালে কঙ্গনাকে আইনি নোটিশ পাঠিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান হৃত্বিক। তবে কঙ্গনা ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করে পাল্টা আইনি নোটিশ পাঠান এবং হৃত্বিকের বিরুদ্ধে ভয় দেখানোর গুরুতর অভিযোগ আনেন। দীর্ঘ এই আইনি লড়াই এবং পারস্পরিক অভিযোগের ফলে দুই তারকার সম্পর্ক এখন চূড়ান্ত তিক্ততার পর্যায়ে পৌঁছেছে।











